রাজুর মাদার’স ডে

নাম রাজু। বয়স নয় বছর। থাকে ঐ লিচু বাগানের পাশের বস্তিতে। রাজুর সংসার, মা আর একমাত্র ছোট্ট বোন খুশি। না না বাবা মারা যায় নি, তবে এদের সাথেও থাকেনা। ঢাকা শহরে রিকসা চালাতে গিয়ে নতুন সংসার পেতেছে অন্যজন কে নিয়ে। তাই রাজু, খুশি, আর তাদের মায়ের খোজ নেবার সময় পায়না।

তার বাবা তাদের ছেড়ে চলে গেলে প্রথমে খুব কষ্ট হয়েছিল কয়েকমাস বোনটা যে একেবারেই পিচ্চি কয়েকদিনের ছিল। বেশ কয়েকমাস হয়ে গেল এইঘটনার এখন খুব সুখে না থাকলেও তিনবেলা শাক দিয়ে ভাত ছোটে পেটে। মাঝে মাঝে দুধ দিয়েও ভাত খেতে পাই রাজু।

বড় আত্মসম্মানী মহিলা রাজুর মা সে অন্যের বাড়িতে কাজ করবেনা তাই ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে একটা গায় গরু কিনেছে সেটার দুধ বিক্রি করেই কিস্তি আর সংসার টা কনোমতে চলে যাচ্ছে। কিন্তু রাজুর স্কুল যাওয়া বন্ধ। রাজু বেশ পড়াশুনায় ভাল মায়ের ইচ্ছে রাজু তার বাবার মত রিকশাচালক হবেনা ভাল কিছু হবে। কিন্তু এখন সংসারের যে অবস্থা তাতে এবছর টা রাজুর স্কুল যাওয়া সম্ভব না। সারাদিন কত কাজ করে রাজু। ঘাস কেটে আনে, আশেপাশের বাড়ি গুলো থেকে মাড়পানি নিয়ে আসে, দুধ দিয়ে আসে মানুষের বাড়িতে বাড়িতে আবার মা যখন কাজ করে ছোট বোনটাকেও সামলায়। বয়সে ছোট হলেও রাজু তার বাবার মত দায়িত্বহীন নয়। সে বোঝে তার মায়ের কষ্টটা। ছেড়া প্যান পরে যখন ঘুরে বেড়ায় অন্যান্য ছেলেমেয়েরা দেখে হাসাহাসি করছিল সেদিন ওর খারাপ লেগেছে কিন্তু মাকে এসে বলেনি জানেতো মায়ের কাছে টাকা নেই টাকা হলে ঠিক কিনে দেবে। মাকে দেখে খালি পায়ে হাটতে স্যান্ডেল কেনার পয়সা নেই। পহেলা বৈশাখের দিন সবাইকে নতুন জামা কাপড় পরে পার্কে যেতে দেখে সেও বাইনা করেছিল পার্কে যাবে মায়ের সাথে কিন্তু মা যেতে রাজি হয়নি তাই একটু কেঁদে ছিল। পরে বুঝেছে ওসব জায়গায় ছেড়া কাপড় পরে যাওয়া যায়না আর মায়ের ও রাজুর মত ভাল শাড়ি জামা নেই। দুদিন পর পর ই রাজু মাকে দেখে ছেড়া শাড়িদুটোতে তালি লাগাতে।

সকাল বেলা চারটে পানতা ভাত খেয়েই রাজু মাঠে গরুনিয়ে যায়। গরুটাকে ডাঙর দিয়ে আবার ঘাস কাটে রাতের জন্য। তারপর বেলা হলেই বাড়ি বাড়ি দুধ দিয়ে আসতে হয়। সেদিন একবাড়িতে দুধ দিতে গিয়ে শুনেছিল মাদারস ডে কথাটা। ঐ বাড়ির ছেলে মেয়েগুলো প্ল্যান করছিল তাদের মা কে কি দিবে গিফ্ ট। রাজুর বয়সী মেয়েটা রাজুকে জিঙ্গেস করলো রাজু তুই কি দিবিরে তোর মাকে? রাজু কিছু না বলেই মাথা নিচু করে বেরিয়ে চলে আসলো। তারও মাকে কিছু দিতে ইচ্ছে হয় কিন্তু এজন্যতো টাকা লাগবে সেটা কোথায়!

পরের দিন সকালবেলা মা ঘুম থেকে জাগার আগেই রাজু গায়েব। রাজুকে দেখা গেল লিচু বাগানে সেখানে লোকজন লিচু নাবাবার প্রস্তুতি নিচ্ছে। রাজু গিয়ে বলল কাকা আমি ভাল গাছে উঠতে পারি এক্কেবারে উঁচুতে তোমার সব লিচু পেরে দিবো তাহলে কি দেবে বলো?

- দেখ রাজু পরে গেলে কিন্তু ঠ্যাং ভেঙে যাবে তখন যেন আবার তোর মা
কথা শেষ না হতেই আরে কিছু হবেনা এর থেকে বড় বড় গাছে গাছে আমার উঠে আমার অভ্যাস আছে। বলো পেরে দিলে কি দেবে?
-লিচু খেতে দেবো।

রাজু লাফ দিয়ে গাছে ওঠে গেল। লিচু নামানো শেষ হলে গাছ ওয়ালা বেশ অনেক গুলো লিচু দিলে সেখান থেকে ছোট বোনটার জন্য কয়েকটা নিয়ে গাছওয়ালাকে বলল কাকা এতগুলো ত খেতে পারবনা তুমি বরং এগুলো নিয়ে আমাকে টাকা দাও। টাকা কি করবিরে?

- মার জন্য কিছু কিনবো।
লোকটা কিছু না বলে শুধু রাজুর মুখের দিকে তাকিয়ে দুইশটা টাকা বের করে দিল। রাজু খুব খুশি। বড় মায়া হয় ছেলেটাকে দেখলে সবার।
রাজু কাছের বাজারের দিকে দৌড়াতে থাকে একটা দোকানে গিয়ে বললো দুশো টাকা দিয়ে মামা একটা শাড়ি দেনতো।

লোকটা হেসেই বললো দুশো টাকাই কি শাড়ি হয়রে পাগলা। আরো টাকা লাগবে।
রাজুঃ কত টাকা লাগবে আরও?
_আগে বল কেমন শাড়ি নিবি? 
_ রাজু একটা আকাশী শাড়ির দিকে আঙ্গুল তুলে বললো ঐ শাড়িটা। মায়ের খুব পছন্দ আকাশের রং।

_ তবে যা তোর মায়ের কাছ থেকে আরও ৩০০ টাকা নিয়ে আয়।
এবার রাজু মাথা চুলকাতে চুলকাতে বেরিয়ে আসতে আসতে বিরবির করে বলতে লাগলো আরো টাকা কোথায় পাবো!

ভেবেছিল মাকে একটা শাড়ি কিনে দিবে মাদারস ডে তে, মা খুব খুশি হবে। কিন্তু. ভাবতেই মনটা খারাপ করে একটা গাছের নিচে বসে আছে। একটু দুরে দুজন কপত কপতি বেশ জোরে সোরে কথা বলছে মেয়েটা বাইনা করছে ঐ ডোবা থেকে বাতরাজের ফুল( কচুরিপানা) তুলে এনে দিতে। কি মুশকিল ঐ পানির মধ্যে এখন নামবে কে যদি সাপ থাকে।

রাজু ওদের কির্তীকলাপ দেখে হেসে ওঠলো এটা কোনো ব্যাপার হলো রাজুতো রোজই এই ডোবাই নামে গোসল করতে কই তাকেতো সাপে কামড়ায় না!
রাজু কে হাসতে দেখে কাছে ডাকলো ছেলেটা তারপর বললো এই পিচ্চি কয়েকটা কচুরিপানার ফুল তুলে দিতে পারবি? 
- রাজু সাচ্ছন্দেই বলল হ্যা পারবো কিন্তু টাকা দিতে হবে।

কি আর করা প্রেমিকার আবদার মেটাতে এতটুকুতো করতেই হবে। তাই রাজুর হাতে বিশটাকা দিয়ে বলল যা নিয়ে আয় কিন্তু না রাজু এতে রাজি না পুরো একশ টাকা হলে তবেই সে নামবে পানিতে তাকেও তো সাপে কাঁমড়াতে পারে তার যুক্তি। বাধ্য হয়েই দিতে হলো একশ টাকা।
কিন্তু এখনো তো আরও টাকা লাগবে!
ওদিকে মা রাজুকে খুজে খুজে হয়রান আজ তাকেখুজে না পেয়েই কনো কাজই হয়নি।

তাই মা খুব চেঁচাচ্ছেন।
এবার রাজু একটা সেলুনের পাশে গিয়ে দাড়িয়ে বললো মামা আজ আমি তোমার সাথে কাজ করবো সারাদিন সব হুকুম শুনবো আমাকে কাজে রাখবে? সেলুন ওয়ালা বলল তুই আবার আমার কি কাজ করবিরে? করতে চাইতে কর কিন্তু টাকা দিতে পারবনা। বড় খাসটা লোকটা চেহারাটার মতই মনটাও। টাকার জন্যই কাজ করবে বলছে আর টাকাই দিবেনা!

মনটা খারাপ হয়ে গেল আবার। পাশেই দুষ্টু প্রকৃতির কিছু বালক দিড়িয়ে ক্যারাম খেলছিল রাজুকে দেখে বললো কিরে রাজু টাকার খুব দরকার মনে হচ্ছে গাজা খাবি নাকি? হা হা হা করে হেসে উঠলো সবাই।

রাজু চুপচাপ হাটা শুরু করলো। এবার বিলাশ নামের ছেলেটা বললো রাজু শোন, আমার একটা কাজ করে দে তোর যত টাকা লাগে দেবো।
_রাজু কি কাজ?
আমার পা টিপে দিতে হবে একঘন্টা তবে।

রাজু রাজি কাজটা করতে কিন্তু শর্তমোতাবেক কাজ শেষে টাকা না দিয়ে উল্টা হাসিতামাশা শুরু করলো আর একজন বলে উঠলো এবার আর একটা কাজ কর তারপর টাকা পাবি তোর মাথা ন্যাড়া করে আয় ঐ সেলুন থেকে তবে পাক্কা টাকা দিবো যা কথা দিলাম। রাজুটা সত্যি সত্যি মাথা ন্যাড়া করে এসে বলল ভাইয়া, এবার টাকা দাও। খুব অবাক তারা! আচ্ছা রাজু তোকে যা করতে বলছি তাই করছিস টাকার জন্য, কি করবি বলতো টাকা?
_ শাড়ি কিনবো মায়ের জন্য কালতো মাদারস ডে তাই।
এবার সত্যি লজ্জা পেল তারা কনো কথা না বলে পকেটে দেড়শো টাকা ছিলো সেটাই বের করে দিয়ে দিলো।

কিন্তু তাতেও তো ৫০০ টাকা হয়নি! দুপুর গড়িয়ে এলো পেটে ক্ষুধা অনুভূতি টা আজ যেন হারিয়ে গেছে রাজুর। একটাই লক্ষ্য ঐ শাড়িটা কিনতে হবে।

রোববার করে এইগ্রামে হাটবসে তাই আজ অনেকভীড় এখানটাই রাজু হাটে গিয়ে বিভিন্ন মানুষের এটা সেটা এগিয়ে দিতে লাগলো মানুষ জন খুশি হয়ে ৫ টাকা দশটাকা করে দিতে লাগলে এভাবে ৭০ টাকা হয়ে গেল। বিশ টাকা বেশী হওয়ায় প্রয়োজনের চেয়ে, ছোট্ট বোনটার জন্য একডজন চুড়ি কিনেছে রাজু। ভাগ্যক্রমে একজন সাথে করে হোটেলে ভাতটাও খাওয়েছে। সন্ধাপার হয়ে আঁধার হয়ে আসছে মা ব্যাস্ত রাজুকে খুজতে এবার কান্নাকাটি শুরু ছেলেকে সারাদিন না পেয়ে। রাজু দোকান থেকে শাড়ি টা নিয়ে বাড়ি ফিরছে বৈশাখ মাস হঠাত করেই ঝড় বৃষ্টি শুরু। শাড়িটা যেন না ভেজে তাই একটা দোকানে রেখে ভিজতে ভিজতেই বাড়ি ফিরলো। মা রাজুকে দেখে রাগে খানিকটা পিটুনি দিলেন সারাদিন কোথায় ছিলি? বাপের মত হচ্ছিস দিনদিন আমি পাগলের মত খুজে বেরাচ্ছি গরুটাকে পর্যন্ত ঠিকমত খেতে দিতে পারিনি আর নবাব পুত্র এতক্ষণ পর উঠে আসছে! আসলি কেন যেখানে ছিলি সেখানো জায়গা হলোনা!

রাজু মার খেয়ে কাঁদছে কিন্তু কিছু বলছেনা সে জানেতো মা রাগের মাথায় বলছে আর সারাদিন মায়ের অনেক কষ্ট হয়েছে। রাজু কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে পরলে মা'ই আবার ছেলেটাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছে আবেগে এ কি রাজুর গায়ে জ্বর! ছেলেটা সারাটা দিন না জানি কোথায় কোথায় ছিলো খেয়েছিলো কিনা কিছু কে জানে! পাশে বসে মা রাজুর মাথায় জলপট্টি দিচ্ছেন আর এসব ভাবছেন।

সকাল বেলা রাজুকে কাছে ডেকে জিঙ্গেস করছেন বাবা কই ছিলি সারাদিন কাল?এভাবে না বলে হারিয়ে যাসনা তোর কিছু হলে আমি কি করবো বলতো! আর মাথা ন্যাড়া কেন তোর?

রাজু মনে পড়লো সে কিছু একটা রেখে এসেছে। মাকে থামতে বলে দৌড়ে গিয়ে শাড়িটা নিয়ে এসে মায়ের হাতে দিয়ে বললো " মা তোর জন্য" 
মা প্যাকেট টা খুলতেই চোখে জল ছলছল কোথায় পেলি?
_ অনেক কাজ করেছি কাল সারাদিন এটা তোমাকে কিনে দেব বলে। তোমারতো ভাল শাড়ি নেই!
মা এবার ভাষাহীন শুধু রাজুকে বুকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কাঁদছেন।
রাজুর শেষ কথা মা আমি বড় হলে আরও কিনে দেবো।

(সমাপ্ত)

উৎস্বর্গঃ মা তোমাকে,
তোমার বহ্নি সোনা


রচনাটি অন্য ভাষায় পড়ুন
English Spanish Hindi Portuguese Arabic Chinese Russian Japanese

বিঃদ্রঃ মুক্তকলাম সাহিত্য ডায়েরি, লেখকের মতপ্রকাশের পূর্ণ স্বাধীনতার প্রতি সম্মান রেখে, কোন লেখা সম্পাদনা করা হয়না। লেখার স্বত্ব ও দায়-দায়িত্ব শুধুমাত্র লেখকের।
আপনার রচিত সাহিত্যসমগ্র স্থায়ীভাবে সংরক্ষণ এবং বিশ্বের কোটি পাঠকের কাছে পৌঁছে দিতে আজই যুক্ত হউন।