তবুও ভালবাসি তোমায় (৩)


আবিরের সাথে দেখা করে আসার পর থেকেই মিষ্টুর ঘরের দরজাটা বন্ধ। মা অনেকবার ডাকাডাকির পর মিষ্টু ঘর থেকে বেরিয়ে এল। মা জিঙ্গেস করলে বলল কিছু হয়নি এমনিতেই পরীক্ষা তো শেষ ভাবছি কয়েকদিন নানু বাড়ি থেকে আসি। মা মিস্টুর মুখের দিকে তাকিয়ে কিছু একটা হয়েছে অনুমান করে আর কিছু বললনা। মা জানে তার মেয়েটার বুক ফাটে তবু মুখ ফোটেনা।
পরের দিন সকালেই মিস্টু রওনা দিল।
ওদিকে আবির পাগল প্রায় হাজার বার ফোন করে চলেছে মিস্টুকে কিন্তু ফোনটা বন্ধ। ফেসবুকেও তার কনো হুদিস নেই। এভাবেই কয়েকটা চলে গেল হঠাৎ মিস্টুর বাড়ি থেকে খবর আসলো বাবা মিস্টুর বিয়ে ঠিক করেছে। ছেলে আর্মি অফিসার। এরাই কিছুদিন আগে মিস্টুকে দেখে গিয়েছিল।
কথাটা শোনা মাত্র মিস্টুর বুকের ভেতর একটা অচেনা যন্ত্রণা অনুভব করলো যা আগে কখন অনুভব করে নি।
আবিরের বাড়িতে প্রায় সবাই বিষয় টা জেনে গেছে আবিরের পাগলামী দেখেই। আবির suicide করার চেষ্টা পর্যন্ত করেছে তাই সবাই তাকে বোঝাতে লাগলো এটা কনো বীরপুরুষের কাজ নই। কারো কনো আপত্তি নেই মিস্টুকে মেনে নিতে কিন্তু আবিরকে তার স্টাডি শেষ করতে প্রতিষ্টিত হতে হবে তবেই না মিস্টুর বাড়িতে সমন্ধ নিয়ে যাওয়া যাবে। আসলে আবির বাবা মায়ের একটি মাত্র আদরের সন্তান তাকে এভাবে দেখে তারা সবাই চিন্তিত। তাদের ধারণা আবির কে এভাবে বোঝালে সে ঠিক রাজি হবে আর সময়ের সাথে সাথে সে মিস্টুকে ভুলেও যাবে।
আবির ও ভাবলো সত্যিতো তাই তাকে মিস্টুর উপযুক্ত হওয়া চাই। তাই সে পড়াশুনায় আবার মনোযোগী হবার চেষ্টা করলো। মনে মনে ভেবে নিয়েছিল যেদিন পড়াশুনা শেষ করে একটা ভাল জব পাবে সেদিন প্রথমে মিস্টুর বাড়িতে যাবে আর সবাই কে বুঝিয়ে বলবে আই হোপ সেদিন আর কেউ কনো আপত্তি করবেনা।
আগামি শুক্রবার মিস্টুর বিয়ে। সবাই কাজে কামে কেনা কাটাই ব্যাস্ত কেবল যার বিয়ে তার মনে আনন্দ নেই। বিয়ের দিন মিস্টুর সেই বুকফাটা আর্তনাদ চিৎকার করে। কিন্তু এটাকে সবাই খুব স্বাভাবিক ভাবেই নিল বিয়ের দিন সব মেয়েরায় এমন কাঁদে।
বিয়ের পরেও মিস্টু মনে মনে আবিরের কথা মনে মনে ভাবে। সত্যি কি আবির মিস্টুকে অনেক ভালবাসে? তবে মিথ্যে বলেছিল কেন আগে?
কিছুতেই এ বাড়িতে মন টিকছেনা তারপর আবার বিয়ে হতে না হতেই শশুড় বাড়ির লোকদের একটা বাচ্চার তাগাদা। সবমিলিয়ে মিস্টুর মনে হতে লাগলো এখান থেকে পালিয়ে বাঁচি। তবু এতকিছুর পরেও একটা বারের জন্য আবিরের কাছে ফোন করেনি বরং সাতপাঁচ ভেবে নিজেকে সবার সাথে মানিয়ে নেবার চেষ্টা। মাস ছয়েক পরে মিস্টুর husband মিশনে চলে যায় দেশের বাইরে। মিস্টু pragnent। কয়েক মাস পরেই মিস্টুর কোল জুড়ে এল একটা ফুটফুটে মেয়ে নাম রাখলো সুপ্তি। ঠিক মিস্টুর মতই হয়েছে দেখতে মেয়েটা। বাচ্চাটাকে পেয়ে অনেকটাই স্বাভাবিক জীবন যাপন এখন তার খুব ব্যাস্ততায় কাটে সময় গুলো আবিরকে তাই এখন আগের মত তেমন মনে পড়েনা। কিন্তু প্রতি সপ্তাহে মিস্টুর বাবার বাড়ির ঠিকানায় চিঠি পাঠাতো কিন্তু উত্তর পেতোনা। আবিরের এখানে ডিপ্লমা শেষ করে দেশের বাইরে চলে যায় পড়াশুনার জন্য।
হঠাৎ একদিন খবর আসলো মিস্টুর husband missione মারা গেছে। মিস্টু খবরটা শুনে সুপ্তিকে বুকে জড়িয়ে ধরে খুব কাঁদতে লাগলো মেয়েটা সবে ৭ মাসের এখনো ওর বাবাকে একটি বারও দেখেনি। হঠাৎ মিস্টু তার শশুড় শাশুড়ির দিকে তাকিয়ে কান্না থামিয়ে খুব শক্ত হয়ে গেল কারণ সে জানে এই সময়টা তাকেই সামলাতে হবে সবাই কে। হয়তো এটাই মেয়েদের কর্তব্য সবকিছুর সাথে নিজেকে মানিয়ে নেয়া।
জীবন কারো জন্যই থেমে থাকেনা দিন কেটেই যায়। মিস্টুর তাই মেয়ে টাকে নিয়ে বাবার বাড়িতে চলে এসেছে বাবা মা আবার বিয়ের কথা বললেও মিস্টু আর রাজি হয়নি। পড়াশুনা টা শেষ করেছে মিস্টু একটা জবের জন্যও চেষ্টা করছে হয়ে গেলে মেয়েটাকে নিয়ে অন্য কোথাও চলে যাবে। ইতিমধ্যে একটা কলেজে মিস্টুর জব appointment letter এসেছে তবে সেটা রাজশাহীর বাইরে। মিস্টুর মেয়েটা সাড়ে চার বছরের হয়ে গেছে। ওকে ছাড়া মিস্টুর একটা দিনও চলেনা। ভারী পাকা পাকা কথা মেয়েটার ওর কথা শুনেই যে কেউ মায়ায় পড়ে যায়। মিস্টু সুপ্তিকে নিয়ে স্টেশনে ট্রেনের অপেক্ষা করছে হঠাত কাকে যেন তার আবিরের মত মনে হলো কিছু ক্ষণের জন্য হারিয়ে গেল অতীতে তারপর সুপ্তির ডাকেই আবার ফিরে এল বর্তমানে। আজ এতগুলো বছর পর আবার এই স্টেশনে এসে কেন জানি আবিরের কথা খুব মনে পড়ছে মিস্টুর। সুপ্তির জন্য কিছু চকলেট কিনে নিয়ে ট্রেন আসলে ট্রেনে গিয়ে বসলো মিস্টু।পাশের সিট টাই একজন বসে আছেন পেপার পড়ায় ব্যাস্ত মুখটা দেখা যায়না। মিস্টুও সুপ্তিকে ভিডিও গেম টা বের করে দিয়ে নিজে একটা গল্পের বই বের করে পড়ছে। মিস্টুর পুরোনো অভ্যাসটা এখনো যায়নি ট্রেনের দোলায় ঘুমিয়ে পড়েছে। সুপ্তি একটা চকলেটের প্যাকেটের সাথে বেশ যুদ্ধ করছে খসর খাসর শব্দ পাশের সিটে বসা যাত্রীটা এবার মুখের সামনে থেকে পেপার টা সরিয়ে সুপ্তির কাজকারবার দেখছে। আর মিটমিট করে হাসছে অবশেষে চকলেটটার প্যাকেট টা নিয়ে নিজেই খুলে দিল প্যাকেট টা। আর জিঙ্গেস করতে লাগলো তোমার নাম কি, বাসা কোথায়, কোথায় যাচ্ছ ইত্যাদি। বেশ মিস্টি একটা মেয়ে সুপ্তি এই অল্প সময়েয় কেমন ভাব জমিয়ে নিয়েছে এই আঙ্কেল টার সাথে। দুজনে বেশ বকবক করে চলেছে হটাৎ চোখ পড়লো ঘুমিয়ে পড়া মিস্টুর উপর হাতে গল্পের বই বাতাসে চুলগুলো থেকে থেকে মুখের ওপর ছড়িয়ে পড়ছে মনে যেন কতদিন পর আজ শান্তিতে ঘুমোচ্ছে তাই পাশের এত আওয়াজ তার কানে পৌছাচ্ছে না।
হঠাৎ এক স্টেশনে এসে ট্রেনটা থামলে ট্রেনের হর্নের শব্দে মিস্টুর ঘুম ভাঙলো সজাগ হয়ে চোখ মেলে তাকাতেই দেখতে পেল সামনের সিটে বসা লোকটা ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে আছে মিস্টুর দিকে চোখে কতখানি জল মিস্টু অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো সেদিকে তারপর খানিকটা তার চোখের কোণেও জল দেখা গেল। দুজনেই চুপচাপ কারও মুখে কনো কথা নেই। অনেকক্ষন পর ক্যামন আছ মিস্টু?
মিস্টু এবার বিষ্ময় ভরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে হুম ঢের ভাল।
তুমি এখানে?
গতকাল দেশে ফিরেছি এসেছিলাম তোমাদের বাসায় যাব তোমার সাথে দেখা করবো ভেবেই বাড়িতেও যায়নি আগে। স্টেশনে অনেকক্ষণ বসে ছিলাম পরে ভাবলাস আগে বাসাতেই যায় বাবা মা কে সাথে নিয়েই তোমাদের বাসাই যাব তাছাড়া তোমার বাবা মা যদি আবার আপত্তি করে।
মিস্টু জাস্ট কথা গুলো শুনে অবাক হলো! আবির, তুমি এখনো? বাকি কথা গুলো আর মুখ থেকে বের হলোনা
শুধু সুপ্তিকে দেখিয়ে বললো আমার মেয়ে।
_ হুম জানি।
জানো! কিভাবে?
এসেই হিয়ার সাথে যোগাযোগ করেছিলাম সেই বলেছে আর তুমি যখন ঘুমাচ্ছিলে তখন সুপ্তি আর আমি পরিচিতি পর্ব টা সেরে নিয়েছি।
_ আবির সবটা জেনেও তুমি!
_ তাতে কি! আমি কাল ও তোমায় ভালবাসতাম আজও বাসি সামনের বাসবো।
আল্লাহ যা করে হয়তো মঙ্গলেরর জন্যই করে তোমার সাথে ও যা হয়েছে সেটার পিছনেও হয়তো
হয়তো কয়েকটা বছর দেরী হলো না হয় দুজনে কষ্টই পেলাম কিন্তু আজ আবার সেই একই জায়গায়!
এবার ট্রেনটা তাদের নির্দিষ্ট গন্তব্যস্হলে এসে থামলো আসলে তারা একই জায়গাই যাচ্ছে। আবির সুপ্তির হাতটা ধরে মিষ্টুকে নিয়ে ট্রেন থেকে নেমে পড়লো তারপর মিস্টুকে একটু ওয়েট করতে বলে দৌড়ে গিয়ে কোথায় থেকে যেন একটা লাল গোলাপ নিয়ে এসে হাটু গেড়ে বসে মিস্টুর দিকে ফুলটা এগিয়ে দিয়ে বলতে লাগলো
I still love u. Will U marry me?
আবির সেই দিন যা করতে পেরেছিলনা আজ সেটা করে ফেলেছে।
মিস্টু শুধু একবার সুপ্তির মায়া ভরা মুখের দিকে তাকিয়ে কনো কথা না বলে আবিরকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগলো।
ব্যাস আর কিছু বলা লাগেনা মিস্টুর অশ্রুই বলেদিচ্ছে তার সমস্ত মনের কথা।
সুপ্তির জন্য হয়তো আবিরের চেয়ে ভালো বাবা আর কোথাও পেতোনা মিস্টু এটাই হয়তো সেই ভালবাসা যা প্রতিটা মানুষ কাম্য করে।


রচনাটি অন্য ভাষায় পড়ুন
English Spanish Hindi Portuguese Arabic Chinese Russian Japanese

বিঃদ্রঃ মুক্তকলাম সাহিত্য ডায়েরি, লেখকের মতপ্রকাশের পূর্ণ স্বাধীনতার প্রতি সম্মান রেখে, কোন লেখা সম্পাদনা করা হয়না। লেখার স্বত্ব ও দায়-দায়িত্ব শুধুমাত্র লেখকের।
আপনার রচিত সাহিত্যসমগ্র স্থায়ীভাবে সংরক্ষণ এবং বিশ্বের কোটি পাঠকের কাছে পৌঁছে দিতে আজই যুক্ত হউন।