পঞ্চবেকী

০১.

'তাই তাই তাই
মামা বাড়ি যাই

মামি দেছে দুধ ভাত
দুয়ারে বইয়া খাই
মামায় আইছে ঠ্যাঙ্গা লইয়া
পালাই-পালাই। '

কলার ভেলায় ভেসে ভেসে আজ আমি শামুক কুড়ানো শৈশবে ফিরি। পাঁচবাঁকা ছোট নদী, কেয়াকাটা, হোগলা, ধানক্ষেত, ডিঙ্গিনাও বাঁধা ঘাট, বাঁশবন, শাপলা পুকুর, গোয়ালঘর, মেই, গোবরলেপা উঠোন, চড়ুইপাখি- ওই যে আমার আঁতুড় ঘর!

'ইটকির মিটকির চামের দ্বারা
রগু কইছে পাইত পাড়া
ইয়াল কাট দিয়াল কাট
রাজায় কইছে ছিনিয়াত কাট। '

'ছি বুড়ি ছাইয়া বাবুলের মাইয়া
বাবুল কান্দে কাঁচা কাডাল খাইয়া। '

০২.

'ম্যাবাই গ্যাছে উত্তারে
নল কাডে ছত্তারে
নলের মাতায় টিয়া
ভাবিছাবের বিয়া। '

গোবর লেপা উঠোনে সেদ্ধ ধান রোদ পোহালে আনন্দ নির্বাসনে যাই। ধানক্ষেত, কলাবাগান, নল-খাগড়া ঝোপ হয় বসতভিটা। কচুরিফুল শরীরে ফড়িঙেরা নেচে গেলে ফড়িঙের পিছু ছুটে ছুটে আমরাও ঘাসফড়িঙ- গঙ্গাফড়িঙ- মাছরাঙা। চামচিকার পিছু ছুটে চামচিকা।

'চামচারা ভাই ভুলানি
মাইয়া নেতে আবানি
মাইয়ার মাতায় ঢোড়া সাপ
লাফ দিয়া পড়ে বেয়াই সাব। '

০৩.

'লেরি লেরি কুবাইত্তা
বগা বগা ঠ্যাঙ
কুবাইত্তাগো প্যাডে ভিতর
আড়াই আজার ব্যাঙ
ডাহে কডাঙ কডাঙ। '

শামুকের ডিমের মতো সাদা দিন। ঘুড়ির সাথে আকাশ ছোঁয় লাল-নীল ইচ্ছেপাখি- টাকটিক-টাকটিক- কেঁচোর মতো গড়াগড়ি- কাঁকড়া দৌড় শেষে শুধু পানকৌড়ি পানকৌড়ি কাদামাটি জলখেলা।

'এইডু কি?
-উবি
-মোরে পারলে ছুঁবি
-উবি লইয়া ঘরে যায়
মাইয়া মানের লাতি খায়
মাইয়া অইছি মুই
লাতি খাও তুই। '

ঝিঁঝি পোকা স্বভাবে সারাদিন কেটে গেলে বয়স্কদের রক্তাভ চোখের দিকে তাকিয়ে ভাবি- যদি বড় হতাম!

০৪.

‘আধগান কৈ মাছ, তাল গাছ বায়
সোনার কইতার উইরা যায়
হাজু মাজু বাড়ি আয়
পাহা ক্যালা কাউয়ায় খায়। ’

গোয়াল ঘরে ধুপধোঁয়া- গন্ধ। আলুর মেন্দায় পোকা-সঙ্গীত। ঝাঁক বেঁধে জ্বলে নিভে জোনাকির বিয়ে। খেলায় খেলায় লিপিও আমার বৌ হলে শাপলার ঠোঁটে জোছনার হাসি- বাবুই ঘরে জ্বলে জোনাকি পিদিম। তারপর একদিন লিপি ভরা জলে ডুবে গেলে শাপলা পাতার নিচে খুঁজে খুঁজে একটি শালুক।

০৫.

'এলেনা বেলেনা বাবুকে দুম
ছালেকা মালেকা সালাই মালাইকুম’

দূরে শেয়ালের হাঁক। পাইতরা ঝোপে জ্বলে পেতনীর চোখ। ঘুণের গুড়ি বৃষ্টিতে কাঁথার আদরে ডুবে গেলে রাত দুপুরে ঢেঁকি গান গায়। পিঠাপুলি আনন্দে নাচে প্রজাপতি প্রাণ।

'মনু নাচে বায়
তিন কুলা ধান পায়
মনুর নানি খাদুনী
নিত্য পিডা খায়
গুছই ভরা পিডা থুইয়া
মনুরে কান্দায়। '

০৬.

'মোগো মনু ভালো
আম কুড়াইতে গ্যালো
পাক্কা আম দেইক্কা মনু
চিত্তারাইয়া পড়লো।
আড়ে বিষ নাড়ে বিষ
চাউল কুড়াইয়া খোলায় দিস
চালের উফার মোরগ উইড্ডা বাগ দিস
কুক্কুরুতু কুক
জামাই বাড়ির সুখ। '

চিড়ে মুড়ি গুড়। উনুনে খইয়ের সাথে হেসে ওঠে বৈশাখ। কৃষ্ণচূড়া সোনালু জারুলের পথ পেরুলে ষোল কুড়ার মাঠ। ঝিনুককাটা আম। শামুক ঝিনুক খেলা- ইন্দবাড়ির মেলা। আগুনরোদ স্নানে ফালি ফালি তরমুজ দিন।

‘জামাই আইছে ঘামাইয়া
ছাতি ধর নামাইয়া
ছাতির উফার বল্লা
ধর জামাইর কল্লা। ’

০৭.

‘পিরিপিরি বৃষ্টি পড়ে
ঘর বাড়ি মাঠে
মামি তুমি কাইন্দনা
মামু গ্যাছে হাটে। ’

ঘুঙুর পরে নাচতে থাকো মেঘকন্যা। বৃষ্টি আঁকো। ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টি আঁকো চোখের পাতায়। বৃষ্টি আঁকো রুবিনাদের ভেতর বাড়ির সাদা খাতায়।

বৃষ্টিবেলা বৃষ্টিবেলা। ঝরতে থাকুক সারাবেলা। নাচতে থাকো ফড়িঙ নাচে মেঘকন্যা। বৃষ্টি গানে। বৃষ্টি ঝরুক সবুজ প্রাণে, অবুঝ প্রাণে।

চালতা ফুলের সাদা বৌটি ভিজুক এবার। ভিজতে থাকুক শাপলা পাতা- ব্যাঙের ছাতা- ইশকুলগামী বালিকাদের মাথায় দেয়া কলাপাতা। ভিজতে থাকুক ষোড়শী কদম- ভিজুক এবার ষোড়শীরা।

০৮.

আমি কি আর জানতাম চোখের শেকল ছিঁড়ে সুতোকাটা ঘুড়িটার মতো তুইও উড়ে যাবি! বসন্তেও পাতা ঝরে সবকিছু ক্ষয়ে যায়। সবটুকু যায়? একটুও থাকেনা জমা ভোরের রোদে- পায়রার পালকে? একবারও যাইনি কি ছুটে ঘুড়ি কাটা মাঠে? পুরনো গানইতো গাই রোজ। চোখের ওপর মেলে ধরি স্মৃতির অ্যালবাম।

‘ট্যাঙরা মাছের ট্যাঙ ট্যাঙি
বায়লা মাছের ঝোল
খায়রা আইছে মাইয়া নেতে
তিনডা আনছে ঢোল। ’

০৯.

‘ট্যাঙরা মাছের ট্যাঙ ট্যাঙি ভাই
বোয়াল মাছের দাঁড়ি
হেই দাঁড়িতে চইররা গ্যালাম
খা সাহেবের বাড়ি। ’

ও অ্যালবামরে; আমার সবুজ ঘাস দে- খালি পায়ে হাঁটি-হাঁসের ঝরা পালক ছোঁয়াই শামুকের সাদা ডিমে-প্রান্তরের পর প্রান্তর ছুটি দিগবিদিক ফড়িঙ নাচে। কাশফুল-ঘাসফুল-কেয়াকাটার ঝোপ হয়ে স্মিতার সাদা চোখে ডুব দিয়ে বলি- চল আকাশ ছুঁবো! স্মিতা; স্মিতারে কতোদিন স্বপ্নঘরে যাইনি। গোল চাঁদ রাতে শেফালি তলায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ফুল বিনিময়ে কি হয় আমি কি আর তখন জানতাম তা। কী যে বলতে চেয়েছিলি কতোদিন আজো শোনা হয়নি সেই সব কথা সুর ও শব্দ।

‘কামার বাড়ির টুকটাক
কুমার বাড়ির চাক
জ্বলিস না পুড়িস না তুত
শীতল অইয়া থাক। ’
১০.

পাকা ডুমুরের মতো ভোর ফোটে আর আমি পিতামহের পায়ের ছাপ খুঁজি। ডান অলিন্দ থেকে বাম অলিন্দে বহতা রক্তের স্রোতে বয় বাওয়ালী সঙ্গীত-

‘আরো জোরে
-হেইও
-জোরছে বলো
-হেইও
হেইয়োচ্চো হেইজোয়ান
মাইয়ার চাইতে
মায় জুয়ান। ’

হুক্কার টানে টানে জেগে উঠে ম্যাডাঘর। আজগর, মোবারক, রুস্তুমের করাত টানে কাঠ চেরাইয়ের সঙ্গীত-

‘আধমুইন্না বোস্তা
দেড় মুইন্না নাস্তা
আডার পিডা কলের পানি
রাইত পোয়াইলে টানাটানি। ’

কোথায় ম্যাডাঘর- প্রাণের সঙ্গীত! আজগরের কবর সন্ধ্যার জলে। স-মিলে হাত কেটে ভিক্ষে করে মোবারক। সব হারিয়ে রুস্তুম কোথায় গেছে কে জানে।

আজিম, লাভলু, রাজিব- নেভি, নাসির গোল্ড, গোল্ডলিফ। যে দিকে ফিরাই কান যন্ত্রশব্দ- বাতাসে বাতাসে ব্যান্ড সঙ্গীত

১১.

উঠোনের এককোণে পড়ে আছে। পড়েছে ধূলির প্রচ্ছদ। উইপোকা বেঁধেছে বাসা। বৃদ্ধ হলে ঘর থাকে না- বয়স স্রোতে ক্ষয়ে যায় প্রয়োজন অধিকার

নানিমাদের পায়ের চাপে ধান হতে চাল কিংবা চাল হতে শৈশবের চেতনার মতো সাদা গুড়ো করে আমাদের ভাবনার গান গেয়ে যায় ঢেঁকি-

‘ফাতু চাল কুড়াইতে যায়
ফাতু ঢেঁহির গুতা খায়
ফাতুর মায় নাই ঘরে
ফাতু কিত্দা কি করে। ’

সময় বয়সী হলে কলেভাঙা চাল গুড়ো- নানিমারা কিছুতেই যে কল হতে পারে না!

উঠোনের এক কোণে পড়ে থাকা ও আমার শরীরের কোষে কোষে গান গেয়ে চলা নানিমার ঢেঁকি- নিজে ভেবে একবার বলে যাও- বৃদ্ধ হলে কেন ঘর থাকে না?

১২.

‘আমেনা জামেনা
আগানে বাগানে যাবিনা
উড়াল ভূতে টাইন্না নেলে
ফির্রা আবি না। ’

কোথায় উড়াল ভূত, মাউচ্ছা পেতনী- মৌচ্ছার ভিটায় এখন বৈদ্যুতিক আলো জ্বলে। হাসপাতালে নেয়ার আগে যে শিশু ডায়রিয়ায় মাঝি নায়ে মারা গেছে- কি করে জানবে ও- এখন এখান থেকে হর্ণ বাজিয়ে মটরযান চলে যায়। সুপুরির খোলে চড়া কিশোর বয়স বাই-সাইকেলে রাস্তার প্রান্ত খুঁজে। হাঁসের বাচ্চার জন্য শামুক কুড়নো জমি ছাড়ে ইট ভাটায় দীর্ঘশ্বাস

‘কাইল্লা ভূত কাইল্লা ভূত
আগুন জ্বলে ফাতফুত। '

ভূত নেই। তবু হায়! কিশোরীরা সব মায়া ছিন্ন করে আম ডালে ঝুলে

১৩.

‘আবলা বছির তিন কোণা
চাইলতারে কয় বেদানা
ঝিনইরে কয় পানসী নাও
ব্যাঙ্গেরে কয় দুধের গাই
ছদনের পো মদনের জামাই। ’

শেষ তেলটুকু শেষ হলে সোনা জোছনায় ছড়ায় ছড়ায় চেরাগ আলীর বৌ বাজায় ছোবড়া ছেচার গান। টুকটাক-টুকটাক ধ্বনিতে রাত বাড়ে- জোছনা বাড়ে। ছোবড়ার গুড়ি, ঘামে স্যাঁতস্যাঁতে শরীরে কি ক্লান্তি নেই? চায় না কিছু?

চেরাগ আলির ঘরে চেরাগ জ্বলে না। তবু ছেঁড়া ছাউনী ছুঁয়ে চুইয়ে পড়ে চান্দের আলো। বৃথা চান- বৃথা জোছনা। হায়! মায়াবী জোছনা। দারিদ্রতা কষ্টের ঝগড়ার ফুলঝুরিতে এক তালাক, দুই তালাক, বাইন তালাক- তুমি অসহায়।

‘লিহির কামড় য্যামন ত্যামন
পুইজ্লার কামড় সয়
বুইড়ার কামরে বউ
ঘরের বাহির হয়। ’

কতো সাধ ছিলো ঝিনুক খোলস বন্দী প্রাণ ’পরে- ছোবড়ার আঁশ বেঁচে গোলপাতার নতুন ছাউনী হবে ঘরে।

১৪.

‘ঢং করিসনা ঢং করিসনা
কলই মোল্লার ঝি
তোরে মুই নেতে আইনায়
গরুডা আরাইছি। ’

যদিও ভিন্ন সুর বেজে যায় চেরাগ আলির বুকের বেহালায়-
দুলফা ঘাসের নাহান তোর নরম পায়ের ছোঁয়া কি আর পরবেনা এই পোতে? ও পরাইন্নারে! এই হানের কঠিন জমিন তোর লাইগগা কোফাইয়া কোফাইয়া নরম বানাইছি- ফুল ফোডাইছি বাসের। তোর লাইগগা আন্ধার ঘরে ফকফইক্কা আলো জ্বালাইছি। নয়াল জলের মোর কোলা ব্যাঙ ডাক কি তুই হোন না?

মুইতো জানি, মাইডডা কলস ভাঙলে আর জোড়া লাগে না। কি হরমু, পরানের ভিতর আছুক্কা আছুক্কা কামড় দেয় বাসনার কুত্তা। আর হেয়া ছাড়া, কিচির মিচির মুরহার ছাও পরানতো আর অউফরা দিয়া বাইন্দা রাখতে পারি না। তাই কই দ্যাহা দে দ্যাহা দে- ছোঁয়া দে ছোঁয়া দে- জল দে ঢেউ দে জল দে- না হয় আসমানের চান অইয়া পূর্ণিমায় পূর্ণিমায়

‘চালের উফার খাইড্ডা
ম্যাঘ যা কাইড্ডা। ’

১৫.

‘কালা কালা জোঁক
ল্যাক ল্যাকাইয়া ওঠ’

টোপাপানা পুকুরে ছুড়ি ঢিল কামান। ঢিলে ঢিলে টোপাপানা ফাঁকা হয়। মিলে যায়। ফাঁকা হয়। মিলে যায়। এক একটি ঢিলে যতটুকু ফাঁকা হয় মিলে যায় তারচে ঢের। অবুঝ সবুজ চেতনা কি বুঝে আর সবুজের বিরুদ্ধে চলে না সংগ্রাম।

‘আড়ির উফার আড়ি
আমার লগে যে যুদ্ধ করবে
থাকবে না তার দাঁড়ি। ’

১৬.

আমি জানি তোর বয়সী একটি পাখিও আর বেঁচে নেই। তবু তের বছর পরে তোর চোখের মতো পৃথিবীর তাবৎ বিস্ময়মাখা পাখির চোখ দেখে চোখের ডালিম জলে এগারতে আটকে থাকা তুই টোপাপানার মতো ভেসে উঠলি সাথী খালা।

‘অইলদা পক্কিরে
কাফুর কাচা দে
মোরা যামু বাঘের বিয়ায়
কোমর নাচাইতে। ’

তুই কি পাখি হয়ে এসেছিস কিংবা পাখিটি তোর মতো ছড়া জানে কি না, জিজ্ঞেস করার আগেই চোখের শেকল ছিড়ে উড়ে গেল ঠিক তোর মতো একটি পাখি।

১৭.

‘তিন তিনা তিনা
ছাগলে খাইছে চিনা
গরুতে খাইছে ধান
মনুর লাইগ্গা দুই পয়সার
বাজনা কিন্যা আন। ’

চাইনিতো লাঠি লজেন্স, লাল জামা- খাঁচায় এনে দাও আকাশের পাখি বলে ধরিনি বায়না। তবু চোখের শেকল ছিড়ে চলে গেলে!

চোখের শেকল ছিড়ে গেলে। তবু আমার এ চোখ ঘরে জ্বলে চোখ। নৈঃশব্দ্যে শব্দ পাখি কথা কয়

শৈশবের সুতো কাটা ঘুড়ি কোন বাগানে হারিয়ে যাওয়া আমার মারবেল

চাইনিতো লাল প্যান্ট, নতুন স্যান্ডেল। বায়নাতো ধরিনি আকাশের নীল এনে ভরিয়ে দাও আমার শ্লেট-তালপাতা। তবু মায়ের চোখে আষাঢ়-শ্রাবণ- ভাদ্রের জল- বাবা ডাক দূর আকাশের পাখি

১৮.

‘আনিগুনি মাঝা ভাই
ডিঙ্গি আনতে মনে নাই
ডিঙ্গি নেছে চোরে
মাঝাভাই এহন ঘোরে। ’

ডুব দিলেই ছবি। ঘাস ফড়িঙের মাঠ। মাঠের পাশে নদী। চলছে নিরবধি। নদীর পাশে সাঁকো। পাড়ি দিলেই ঘন বনের ছায়া। বেতফলের মায়া। খেঁকশিয়ালের হাক। সেঁতারের সুরের মতো ছোট একটি নদী আমার। পাঁচটি তাহার বাঁক। রঙধনু দুষ্টুমিতে দুলতে থাকে সাঁকো। সাদা সাদা পৃষ্ঠা মনে এই ছবিটি আঁকো।

‘টুপুর টুপুর টুপ
ঘোলা পানি, ঘোলা পানি
পানকৌড়ি ডুব। ’

এখনো আমার চোখে ডোবে বালক বেলা ডুব। তাই শহর চেনা হয়নি আজো
১৯.

যদি রোজ রোদ পাঠ করো-শামুকের ডিমশাদা কবিতাটা কেবল তোমার জন্য। কবিতা পাখি। কবিতা মাছ। কবিতা জল। কবিতা ঘাস। কবিতা পাতা- পাতাবৃষ্টি কবিতা তুমি-কবিতা বাড়ি। কবিতা কাসার বাটির শব্দে শব্দে মাতোয়ারা ঝিঁঝি পোকা-

‘ঝিঁঝি ভাই ঝিঁঝি ভাই
তোর মায় তোরে হালাইয়া
কলাই ভাজা খায়।
গুয়ার মাতি লরে চরে
ঝিঁঝি আইয়া হাতে পরে
ও ঝিঁঝি ফাররুত
ও ঝিঁঝি ফুররুত। ’

কবিতার জন্য রোজ পিতামহের পায়ের ছাপ খুঁজি। তবু মাইক্রোওভেনে কেক হয়- ঢেঁকিহীন ভাঙাচুরো ঢেঁকিঘর কাঁদে।

ঘুণে ধরা হৃদ্যতার কথা তুমি আমায় বলো না। রঙধনু চিঠি দিও- এসএমএস আমি বুঝি না।

২০.

তন্দ্রায় বাজে সুর। বুকের শরতাকাশে ভাসে ছিটে ছিটে মেঘকথা। দরোজার ওপাশে পলাপলি কুক, কার যেন মুখ। পৃষ্ঠায় পৃষ্ঠায় শিউলি হাসি, ঘাসফুল চোখ, কাশফুল হাত

‘ঢেক ঢেকি বেলি
আমরা সবাই খেলি। ’

সুখ সুখ স্মৃতিবদ্ধ কথা ব্যথারা আর্কাইভস থেকে তুলে আনে ফড়িঙ ফড়িঙ দোয়াত, তালপাতা দিন হারানো মার্বেল শারদীয় বর্ষার গান

ও বহুদিনের চেনা (অচেনা) মুখ; এক গোল্লাছুটে চল যাই- ভাদ্রের হাঁটুজলে কাগজের নাও ভাসাই।

২১.

‘আতাপতি আয় আয়
কাক ডাকে কা কা
রাম দুই সাড়ে তিন
অমাবইস্যায় ঘোড়ার ডিম। ’

‘ল্যাংডাকাডি
তুলার ডাডি
খালদারে বইয়া মরিচবাটি
মরিচ গ্যাছে গাঙ্গে
ঐ বাড্ডা তোর লাঙ্গে’।

ছেঁড়া জামা- ছেঁড়া প্যান্ট- ছেঁড়া জুতো- ছেঁড়া ছেঁড়া কথা- ছিটে ছিটে রোদ- ছেঁড়া ছিটে মেঘ- ছেঁড়া কাগজের নাও- ছিটে ছিটে স্মৃতি- শেকল ছেঁড়া চেতনা- চেতনার শৈশব- ছেঁড়া পাতা- ছেঁড়া চিঠি- হাত ছেঁড়া হাত- পাখির ছেঁড়া পালক- ছেঁড়া ঘুড়ি স্মিতা! স্মিতারে

২২.

‘আদম যারা, পাদম তারা
আগানে বাগানে যাবি না
আবিজাবি খাবি না। ’

কপাট লাগিয়ে কি বন্দী করা যায় রোদ? কাঁথামুড়ো শীত কি বাঁধতে পারে গফুর গাছীর খেজুর রসে ঠোঁট ভেজানো শৈশব? মোরগফুল রঙা চোখের শাসন কি রুখতে পারে মাছরাঙা দিন- সরষে ফুলের মতো হলুদ স্বপ্ন- ইঁদুরের বাসা খুঁড়ে বের করা সোনা সোনা ধান- ছড়া গান- সারা দিনমান

‘ছিয়াল দড়ি ভাই ছিয়াল দড়ি
কিরে ভাই লক্ষ্মীছড়ি
তোমার ছাগলে খাইলে ধান
বাইন্ধা রাখো টান টান। ’

কপাট লাগিয়ে কি বন্দী করা যায় রোদ। রোদ-আলো-রোদস্মৃতি হিপেক্যাম্পাসে জমা থাক সবটুকু রোদ

২৩.

'আয় চান লরাইয়া
বাজু দিমু গড়াইয়া
বাজুর উফার পক্ষী
মোগো মনু লক্ষ্মী। ’

স্মৃতিবদ্ধ কথারা জেগে উঠে। নাও চাঁদ ভেসে যায়
ওপারের কুপিবাতি ঘুমে গেলে সন্ধ্যার জলে মিলে যাওয়া ডকইয়ার্ডের অগ্নিস্রোত ঘুমে যায়। ঘুমে যায় মানুষের বোধ ও অবোধ। শুধু জেগে থাকে জল-ঢেউ-জলধ্বনি

এখানে এখন কোন মুঠোফোন নেই। নেই রিঙটোন সরল চিন্তায় ঘুণেধরা ক্ষত। এখন বিদ্যুৎ নেই। নেই নাও তাড়ানো ট্রলারের চিৎকার। ডাকহীন রাতডাকা পাখি তুমি ডাকো এইবার।

২৪.

‘নাকোট নাকোট
পানের বোট
ধানের উঙ্গা, টিয়ার ঠোঁট। ’

‘শান্তা লতা বাঁশের পাতা
বাঁশ ঝিমঝিম করে
শান্তারে বিয়া দিমু জমিদারের ঘরে
জমিদারের পোলারা মুরগি চুরি করে। ’

আমায় কবিতা তো পোস্টমর্টেম- ঘুড়ি ছেঁড়া বেদনা- নূপুরের নূপুর ছেঁড়া দুপুর- রোদ বর্ষায় পায়ের আলতা গলা পথ।

মাটির ঘোড়া, বাঁশের বাঁশি ভেঙে গেল। মার্বেলগুলো হারিয়ে গেল একে একে ধলাখুকীর জাম ভিটায়।

দুষ্টুমি রঙের দুপুর নূপুর

জাম ভিটাটাও হারিয়ে গেল কলের পেটে। চুপিচুপি কেঁদে উঠি বুকের ভেতর। চোখ ডুবে যায়। চোখ ডুবে যায়। চোখ ডুবে যায়।

২৫.

অতঃপর বাটনে আঙুল নাচে জেগে উঠে মুঠোফোন। পুঁজিবাদের গানের তালে নৃত্য করি-

‘ঝাকানাকা ঝাকানাকা
দেহ দোলা না’

বৈশাখ আসে- পানতা ইলিশ শেষে সারাদিন ফাস্টফুড। মুখের ভেতর ঢেলে দেই অবিরাম পেপসি। সানগ্লাসের ’পরে নাচে পুতুলবাজি-কচি ডাবের জল-দুধের সর শৈশব- পঞ্চবেকী আমার পঞ্চবেকী

কাব্যগ্রন্থঃ পঞ্চবেকী (২০১১)।
প্রথম প্রকাশঃ দৈনিক আজকের পরিবর্তন (বরিশাল)।

পড়া হয়েছে: ১৪৮ বার | প্রকাশের সময়ঃ সোমবার ১৫ এপ্রিল ২০১৯
বিঃদ্রঃ মুক্তকলাম সাহিত্য সংরক্ষণাগারে লেখকের মতপ্রকাশের পূর্ণ স্বাধীনতার প্রতি সম্মান রেখে, কোন লেখা সম্পাদনা করা হয়না। লেখার স্বত্ব ও দায়-দায়িত্ব শুধুমাত্র লেখকের।
পোস্টটি শেয়ার করে অন্যকে পড়ার সুজোগ করে দিনঃ

মন্তব্য 0

কোন মন্তব্য নেই