পাটগ্রামে বিলুপ্ত ছিটমহলে প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপনের নামে বাণিজ্য


জেলার পাটগ্রাম উপজেলার বিলুপ্ত ছিটমহল সমূহে একের পর এক প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপনের নামে নিয়োগ বাণিজ্য ও চাকুরি সরকারি করণের নামে প্রতারণা করার অভিযোগ উঠেছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে স্কুলের ফাইল চুরান্ত। যে কোনো সময় চাকুরি সরকারি হবে প্রচার চালিয়ে সহজে প্রতারণা করছে প্রতারক চক্রটি।

বিলুপ্ত ছিটমহলের পরিবারে চাকুরি সরকারি করে দেওয়ার কথা বলে একটি চক্র সর্বশান্ত করতে মাঠে নেমেছে। জমি লিখে নেওয়া, গৃহপালিত গরু, ছাগল বিক্রি করে টাকা নেওয়া ছাড়াও জমি বন্ধক রেখে অতি চতুর গ্রুপটি হাতিয়ে নিচ্ছে মোটা অংকের টাকা। কোনোকিছু বললে বা টাকা ফেরত চাইলে বিভিন্ন হুমকি প্রদানসহ মিথ্যা মামলা দিয়ে ফাঁসানোর ভয় দেখায় বলে ভুক্তভোগীদের অভিযোগ। উপজেলার বিলুপ্ত ছিটমহল ১১৯ নং বাঁশকাটা, ১৪ নং মৌলভী খিদির বকস, ২১ নং পানিশালা ছলেমান কবিরন নগর, ৮ নং ভোটবাড়ী আজিজুল নগর, ১৩২ নং বাঁশকাটা তাতিপাড়া বঙ্গবন্ধু, ১৪ নং লতামারী তরিমল, ২৩ নং খাসবাস দ্বারিকামারী কুমুর উদ্দিন মছিরন বাড়ী, বিমলা গোপালবাড়ী, ফুলজান রহিম উদ্দিনটারী ও আলিম জামুর বাড়ী বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় নামে উঠানো হয়েছে এসব বিদ্যালয়। সরকারের ১৫০০ বিদ্যালয়বিহীন স্কুল প্রকল্পের নির্মিত চারটি ভবনও দখল করা হয়েছে।

গড়ে ওঠা বিদ্যালয় গুলোর ক্যাচমেন্ট এলাকার মধ্যে রয়েছে একাধিক চলমান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। সরজমিনে একাধিক বিদ্যালয় ঘুরে শ্রেণিপাঠ ও শিক্ষকদের পাওয়া যায়নি। মাসে দু’ চারদিন ২/১ জন শিক্ষক এসে কিছু সময় ৪/৫ জন ছেলে/মেয়েকে ডেকে এনে পড়ান বলে বিদ্যালয় সংলগ্ন প্রতিবেশীরা জানান। অনিয়ম করে গড়ে ওঠা এ সকল নামমাত্র বিদ্যালয় গুলো বিধি অনুযায়ী সরকারি ভুক্ত হওয়ার কোনো শর্তই দৃশ্যমান নেই। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক শিক্ষক জানান, ‘জেলা ও উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস থেকে শুরু করে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিদ্যালয়-১ অধিশাখা, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এবং প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের মাধ্যমে বিদ্যালয় গুলো সরকারি করণের কাজ চলছে। ’ তাঁরা বলেন, ‘১১৯ নং বাঁশকাটা বেসরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক দিব্য নাথের সাথে শিক্ষা অধিদপ্তর ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের যোগাযোগ রয়েছে। ’ এ ব্যাপারে দিব্য নাথ স্বীকার করে বলেন, ‘আমি বিলুপ্ত ছিটমহলে স্থাপিত দশটি প্রাথমিক বিদ্যালয় সরকারি করার জন্য বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সাথে যোগাযোগ করছি এবং স্কুল গুলোর নেতৃত্ব দেই। ’

পুরাতন ফাইল তৈরি, জ্বাল কাগজপত্র, ব্যাক ডেটে পত্রিকায় নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি, মিথ্যা প্রতিষ্ঠার তারিখ দেখিয়ে পাটগ্রাম উপজেলায় ভুয়া স্কুল প্রতিষ্ঠার নামে চলছে বিলুপ্ত ছিটমহলের বেকার চাকুরি প্রত্যাশীদের সাথে প্রতারণা। অর্থলোভী কতিপয় ব্যক্তি গজিয়ে ওঠা এ স্কুল গুলো দ্রুত সরকারি হচ্ছে বলে প্রচারণা চালিয়ে হাতিয়ে নিচ্ছে টাকা। সর্বস্ব হারাচ্ছে মানুষ।

উপজেলার ১নং শ্রীরামপুর ইউনিয়নে বিলুপ্ত ২৩ নং খাসবাস দ্বারিকামারী ছিটমহল এলাকায় ২০১৮ সালে ০৫ মে পাটগ্রাম স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্বাস্থ্য সহকারী মোসলেম উদ্দিন ‘কুমুর উদ্দির মাছিরন বাড়ী নামে বেসরকারি একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়’ স্থাপন করেন। বিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগের নামে ওই এলাকার চার কন্যা সন্তানের জনক জবেদ আলীকে জমিদাতা হিসেবে বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য ৩৩ শতক জমি স্ট্যাম্পে চুক্তিপত্র করে নেন। ২০১১ সালে বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা ও ফাইল তৈরি বাবদ দুই লক্ষ টাকাও নেন মোসলেম উদ্দিন। এর কিছুদিন পর অন্যপ্রার্থী ঠিক করে জবেদ আলীর মেয়ের নাম শিক্ষকের তালিকা থেকে বাদ দেন। একপর্যায়ে বিদ্যালয় স্থাপনের জমি ছেড়ে দিলেও নগদ নেওয়া দুই লক্ষ টাকা দেননি মোসলেম উদ্দিন। টাকা উদ্ধারে ব্যর্থ হয়ে জবেদ আলী ২০১৮ সালের জুলাই মাসে ইউনিয়ন চেয়ারম্যান, উপজেলা চেয়ারম্যান, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, জেলা ও উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা, জেলা প্রশাসক ও দুর্নীতি দমন কমিশনে লিখিত অভিযোগ করেন।

এ ব্যাপারে মোসলেম উদ্দিন অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘এটা সম্পূর্ণ মিথ্যা। ’ জবেদ আলী বলেন, ‘বিলুপ্ত ছিটমহলের বাসিন্দাদের সর্বশান্ত করার হাত থেকে রক্ষা ও টাকা উদ্ধারে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করছি। ’

পাটগ্রাম প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আবুল হোসেন জানান, ‘বিলুপ্ত ছিটমহলে স্থাপিত বিদ্যালয় গুলোর কোনো তথ্য আমাদের এখানে নেই। এ ব্যাপারে জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা (ডিপিও) ভালো বলতে পারবেন। ’ লালমনিরহাট জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (ডিপিও) মো. গোলাম নবী বলেন, ‘এভাবে বিদ্যালয় স্থাপন প্রতারণা করা ও ভবন দখল সম্পূর্ণ বেআইনি। এ ব্যাপারে অভিযোগ পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।



সংশ্লিষ্ট সংবাদ