আমি রিফাতের হত্যাকান্ডে জড়িত শ্রদ্ধেয় নয়ন বন্ডের বিচার চাই না!

আমি রিফাতের হত্যাকান্ডে জড়িত শ্রদ্ধেয় নয়ন বন্ডের বিচার চাই না!

এ কে সরকার শাওন

শনিবার, ২৯ জুন ২০১৯


"নয়নের সাথেও মিন্নির বিয়ে হয়েছিল। এবার প্রমাণ মিললো!" এই শিরোনামটি একটি ধনকুবেরের পত্রিকার! রিফাতকে প্রকাশ্যে একদল গুন্ডা কুপিয়ে কুপিয়ে খুন করলো! যা প্রমাণিত। সেই নির্মম, অমানবিক ও বর্বর ঘটনাকে পাশ কাটিয়ে তিনারা ব্যস্ত মিন্নির আগে বিয়ে হয়েছিল কিনা! নারীর চরিত্র নিয়ে আলাপ করলে নপুংসক জানোয়ারদের সুড়সুড়ি লাগে। নারী কে ধর্ষণের হাত থেকে বাঁচাতে কোন হিরো বর্তমান ক্ষয়িষ্ণু সমাজে অনুপস্থিত!
একমাত্র সিনেমাতেই নায়িকাকে ধর্ষণের হাত থেকে বাচানোর চেষ্টা দেখা যায়। বাস্তবে কেউ নায়ক নন। বাঁচাতে না পারলে কি হবে কিন্তু নারী ধর্ষণ নিয়ে ইনিয়ে বিনিয়ে রিনরিনিয়ে রসালো আলাপে একদল বেশ পটু। পত্রিকার রমরমা ব্যবসা হয়। কারো পৌষ মাস কারো সর্বনাশ! সাধারন মানুষ ও রসালো ফালতু বিষয়ে বেশী আগ্রহী। ইতিমধ্যে মূল ঘটনা পাশ কাটানোর যত কলকাঠি সব নাড়াচাড়া শুরু হয়ে গিয়েছে! প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও প্রভাবশালীরা কোনদিনও কোন এতিমের পাশে থাকে না! আদিমযুগে কিছুটা থাকেলেও আধুনিক যুগে একেবারেই নয়। তো মিন্নির মত অসহায় মেয়েকে একজন সন্ত্রাসী জোর করে বিয়ে করলে কেউ কি তার পাশে দাড়ায়? যেখানে পয়সা প্যাকেট বিরানি নেই সেখানে কেউ নেই! আবার গোটা বিশ্বই সেই এতিমের পাশে থাকবে যদি একজন নজর দেন! Now everything is absolutely centralised. This is not good symptom for the future of country.
কেন বিচার চাইনা তার আগে কেন একজন আসামীকে শ্রদ্ধেয় বললাম তার কারণ নিম্নে দিচ্ছি।
১. পত্র-পত্রিকার মাধমে জেনেছি তিনি বড় বড় লোকের সাথে উঠা-বসা করেন!
২. তিনি অনেকেরই সোর্স
৩. অনেক বড় বড় রথি মহারথিরা তাঁর পক্ষে বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে স্টেটাস দিচ্ছেন!
৪. অনেক দামী গণমাধ্যমও খুন প্রমানের চেয়ে মেয়েটির চরিত্রহনন নিয়ে ব্যাস্ত! আমি যথেষ্ট বোকা হলেও বুঝে গেছি এই জনাব নয়ন অনেক সম্মানিত!
৫. এই ধরনের লোকজনদের সবাই ঘন ঘন সালাম টালাম দেয়!
আরও অনেক যুক্তিসংগত কারণে উনাকে শ্রদ্ধেয় বললাম।

কেন বিচার চাইনা তার আগে ৪ দশক পিছনে যাই। ছোটবেলায় দেখেছি বিচার শালিশ যারা করতেন তাঁরা অনেক সম্মানিত লোক ছিলেন। তাঁরা এখনকার টাউট সালিশদারদের মত টাকা খেয়ে পক্ষপাতদুষ্ট বিচার করতেন না।
তাদের ব্যক্তিত্ব ও বিচার-বিশ্লেষণ ক্ষমতা ছিল ধারালো! বিচার করতে গিয়ে তারা নিচের বিষয়গুলি একেবারেই আমলে আনতেন না।
১. আসামী কোন দলের বা গোত্রের
২.আসামী কোন এম পির আত্বীয় কি না?
৩. আসামী অনেক ধনী কিনা?
৪.ঘুষ
৫. ভয় ভীতি

সর্বজন শ্রদ্ধেয় আমার খুব কাছের একজনকে পারিবারিকভাবে কোনঠাসা হতে দেখেছি এবং ফুঁপিয়ে কাঁদতে দেখেছি এইজন্য যে বিচারের মান বজায় রাখার জন্য তিনি তাঁর আপন ছোট ভাইকেও পুলিশের সোপর্দ করেছিলেন।
তাই ছোটবেলায় আইনের প্রতি অগাধ আস্থা ছিল।

কলেজে পড়ার সময় জানলাম, আইন হচ্ছে মাকড়সার জালের মত। ধনীরা সেই জাল ছিড়ে বের হয়ে আসবে গরীব সেই জালে আটকে মরবে। এল এল বি অধ্যয়ন কালে বন্ধুগণ টিটকিরি দিতে শুরু করলো, "উনি বটতলার উকিল হবেন!" আইনের প্রতি আস্থায় ভাটা পড়তে লাগলো। হতাশ হয়ে ল'তে পড়ছি আর ভাবছি কেইস মামলা পাবো তো! একবার আমাদের বাংলাদেশ ল কলেজে নবীন বরণ অনুষ্ঠানে অতিথি হয়ে এলেন বাংলাদেশের প্রথম মহিলা ব্যারিস্টার রাবেয়া ভূঁইয়া ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদের ডীন ড. এরশাদুল বারী। এরশাদুল বারী স্যার বক্তব্য রাখার সময় আমি চিরকুট দিলাম, স্যার, "আমাদের বটতলার হবু উকিল বলে! আমাদেরই ভবিষ্যৎ কি"! বক্তব্যের এক পর্যায়ে তিনি আমার নাম উল্লেখ করে প্রশ্নের উত্তর দিয়েছিলেন। অনেক আশার বাণী শুনিয়েছিলেন। সেসব মনে নেই। শুধু যে লাইনগুলো মনে আছে তা নিম্নরূপ,
"বর্তমানে দেশে কাউকে 'হারামজাদা' বললেও কিছু মনে করে না। কিন্তু দেশ উন্নত হলে বোকা বলে অপমান করলেও মানহানিকর মামলা করবে! দেশে আরও অনেক উকিল লাগবে। ওকালতি পেশা স্বাধীন পেশা!"
এরশাদুল বারী স্যারের অনুপ্রেরণামূলক বক্তব্য শুনে সেদিন দ্বিগুন উৎসাহে
পড়ার টেবিলে বসেছিলাম।
এরশাদুল বারী স্যারের সেদিনের বক্তব্যের সত্যতার ভার সম্মানিত পাঠকদের উপর ছেড়ে দিলাম। কিন্ত আজ দুই দশক পর আমার মনে হয় নিকটাত্মীয় খুন হয়ে গেলেও অনেকেই, মামলা করতে চান না!

কারণ,
১. বিচারের মারাত্মক দীর্ঘসূতত্রীতা! ইংরেজিতে একটি কথা আছে, " Justice delayed, justice denied."
২. অনেক ক্ষেত্রেই জীবিত অবস্থায় রায় দেখে যেতে পারেন না!
৩. ব্যায় বহুল পিচ্ছিল চলার পথ
৪. গরীবের বা ভিকটিমের পক্ষে কোন উকিল দাড়াতে চায় না। এ ক্ষেত্রে পয়সা, পাওয়ার, প্রচার, পোটেকশন, ইত্যাদি তো থাকেই না বরং নীজের, পরিবারের এমনকি সন্তানের জীবন পর্যন্ত নিরাপত্তহীনতায় চলে আসে!
৫. অনুন্নত দেশে সরকার বাদী, উকিল ও সাক্ষীর কোন নিরাপত্তা নেই।
৬. দায়িত্বশীল পদে বসে হুন্কার দিবে, " কোন ছাড় দেয়া হবে না!" এই দাম্ভিক ও জঘন্য বাক্যের অন্তর্নিহিত অর্থ কি? উনি কে ছাড় দেবার। উনি কি যাকে ইচ্ছে তাকে ছাড় দেন? যাকে ইচ্ছে তাকে ফাঁসিয়ে দেন? উনি তো আইনকে আইনের মত নয় তার খেয়াল খুশীমত ব্যবহার করে দেশের ১২ টা বাজাচ্ছেন!

৭.অনুন্নত দেশে সবচয়ে বড় তামাশা জামিন! দুই টাকা চুরি করলে জামিন হতে চায় না অথচ খুনী ঔ ধর্ষকের জামিন সহজতর। জামিনে বের হয়ে আবার দ্বিগুন উৎসাহে হত্যার উৎসবে মেতে উঠে ভাইদের সরাসরি পৃষ্ঠপোষকতায়। জামিনদাতার ঘোড়ার আন্ডাও হয় না। শুধু গালভরা বুলি যা শুনলে গা জ্বালা ধরে!

কেন আমি বিচার চাইনা?
স্বৈরাচারী হু মু এরশাদের পতনকে ত্বরান্বিত করেছিল তৎকালীন বি এম এ'র যুগ্ম সম্পাদক শহীদ ডা. শামসুল আলম মিলন হত্যাকান্ডের জন্য। ২৭ নভেম্বর ১৯৯০ সালে টি এস সি'র সামনে দিনে দুপুরে হত্যাকান্ডটি হয়েছিল! সাক্ষীর অভাবে খালাস। রিফাতের হত্যাকান্ডেও কেউ সাক্ষী দিবে না।
২. বিচার চাইতে গেলেই সবার আক্রমন হবে ঐ মেয়েটির দিকে। তার চরিত্র হনন খুনের বিচারের চেয়ে প্রাধান্য পাবে!
৩. বিচার চাইতে গেলেই বাদী, বাদীর উকিল বাদীর সাক্ষীর জীবন বিপন্ন হবে।
৪. বিচার কত বছরে শেষ হবে আল্লাহ ছাড়া কেই জানেনা।
৫. বিচার চাইতে গেলেই মামলা তুলে নেওয়ার জন্য টর্চার শুরু হবে।
৬. উকিল সহ বিভিন্ন ঘাটে ঘাটে টাকা দিতে দিতে এই পরিবারটি অর্থনৈতিকভাবে নিঃস্ব হয়ে পড়বে। কেউ সাহা্য করবে না। তবে ফেসবুকে কিছু উহ্ আহ্ দুখের রিএক্ট পাবে! দেশে প্রতিবাদস্বরূপ যেই লোক কোনদিন টু শব্দ করেননি সেইলোককে দেখা যাবে বিদেশে হন্ডুরাসের রাজধানী তেগুচিগালপায় বেশ সোচ্চার এবং মানব-বন্ধন করছেন!
৭. সমঝোতা নির্যাতন! টাকা পয়সার ভাগ বাটোয়ারা নিয়ে আবার কুরুক্ষেত্র বাঁধবে।
৮. ফটোসেশনে ও চামচামিতে ইঁদুরে দৌড় শুরু হয়ে যাবে।
৯. হা হা হা হাসির কারনে। গত দুইদিন অনেকেই বলেছেন এটার বিচার হবেই।
সাথে সাথে অনেকেই হো হো করে হেসেছেন!
১০. আসামীগণ প্রভাবশালী তাই ভিকটিমদের পরিবার একঘরে হয়ে পড়বে।

আর ও অনেক কারণে আমি বিচার চাই না।


  • পড়া হয়েছেঃ ২৪৯ বার
  • প্রকাশিতঃ শনিবার, ২৯ জুন ২০১৯

সর্বশেষ প্রকাশিত