উন্নয়নের রাষ্ট্রপতি, কবি এরশাদের জন্য নতুনীয় শ্রদ্ধা

উন্নয়নের রাষ্ট্রপতি,  কবি এরশাদের জন্য নতুনীয় শ্রদ্ধা

মোমিন মেহেদী

সোমবার, ২২ জুলাই ২০১৯


A K Sarker Shaon

ডাঙ্গায় বাঘ আর নদীতে হাঙ্গর কুমিরের সাথে লড়াই করে

সেই সংগ্রামী জীবনের প্রতীক দক্ষিণবঙ্গের

মানুষেরা আমায় ডাক দিয়েছে।

ওরা আমার অনেক ভালবাসার বাধনে বাঁধা,

ওরা আমায় কাঁদায় হাসায় আবার বুকে তুলে নেয় নদীটার মতো

ভাসায় ডোবায় আবার ভালবাসায় দু'কুল ছাপিয়ে সব উজার করে দেয়

সব মিলিয়ে সেখানে আছে আমার

অনেক প্রেম আমি খুঁজে পাই

সাধারণ মানুষের অনেক বেশী

ভালবাসার গন্ধ; ওরা আমাকে কাছে টানে সাগরের পানে নদীর মতো

( একটি অঙ্গীকার: হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ )

একজন কবির জীবনাবসান হয়েছে। চলে গেছেন তিনি মহান স্রষ্টার ডাকে। তাকে কিভাবে বাংলাদেশের মানুষ মনে রাখবে জানি না। আমি মন রাখবো বিনম্র শ্রদ্ধায়-ভালোবাসায়। সেনা বাহিনী থেকে এসে শক্ত হাতে হাল ধরেছিলেন বাংলদেশ-এর। শুধু কবিতা লিখেনই নি; কবিতার মত করে এগিয়ে যেতে চেয়েছিলেন নিবেদিত থেকে। যে কারণে ইতিহাস সৃষ্টিকারী এই রাষ্ট্রনায়ক রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়ে দুই দফায় সাড়ে ছয় বছর কারাগারে আটক ছিলেন। কিন্তু তাঁর স্বপ্নে ছিলে দেশ ও জনগণের কল্যান সাধন। জেলখানার অন্ধ প্রকোষ্ঠে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়তেন- তবুও ভাবতেন দেশের কথা। দেশ যখন বিপন্ন, মানুষ যখন মানবেতরের চরম সীমায় পল্লীবন্ধু এরশাদ তখন জেলের জিঞ্জির ছিন্ন করে বেড়িয়ে এলেন। তিনি দেখলেন যে দেশকে তিনি সযত্নে সাজিয়েছিলেন সে দেশ ছিন্ন-ভিন্ন হয়ে গেছে। মানুষের সুখ-শান্তি সমৃদ্ধি ভেঙ্গে খানখান হয়ে যাচ্ছে। অর্থনৈতিক সাচ্ছন্দ্য বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। জনগণের জানমালের নিরাপত্তা বলতে কিছুই থাকছেনা। কারামুক্ত পল্লীবন্ধু এরশাদ আর স্থির থাকতে পারলেন না। শুরু হলো আবার তাঁর যাত্রা। এ যাত্রা ভিন্ন আঙ্গিকে। হিংসা-হানাহানির রাজনীতির বিরুদ্ধে সুষ্ঠু স্থিতিশীল গণতান্ত্রিক পরিবেশ সৃষ্টির রাজনৈতিক যাত্রা শুরু করলেন পল্লীবন্ধু। আবার এদেশে উন্নয়ন সমৃদ্ধির ধারা ফিরিয়ে আনা এবং জনগণের নিরাপত্তা-সুখ-শান্তি নিশ্চিত করার সংগ্রামে ব্রতি হলেন এদেশের ইতিহাসের সফল রাষ্ট্রনায়ক পল্লীবন্ধু এরশাদ। তিনি নিরলসভাবে পরিশ্রম করে যাচ্ছেন এদেশের দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোঁটানোর লক্ষ্যে। পল্লীবন্ধু এরশাদ কথার রাজনীতিতে বিশ্বাসী নন-তিনি কাজের রাজনীতিতে বিশ্বাস করেন। তাঁর অতীতের কর্মকাণ্ডের দিকে তাকালেই এ কথার প্রমাণ পাওয়া যাবে। এদেশের এমন কোন গ্রাম নেই -এমন কোন শহর নেই-যেখানে পল্লীবন্ধু এরশাদের উন্নয়নের ছোঁয়া লাগেনি। এখনো এই বাংলাদেশের যেদিকেই দৃষ্টি যাবে সেদিকেই দেখতে পাওয়া যাবে পল্লীবন্ধু হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের উন্নয়নের কর্মসূচী। এই মহানায়কের উন্নয়নের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি এখানে তুলে ধরা হলো।

‘৬৮ হাজার গ্রাম বাঁচলে বাংলাদেশ বাঁচবে’ বলে এগিয়ে গিয়েছিলেন বহুপথ। তাঁর প্রবর্তিত ৪৬০টি উপজেলার ফলশ্রুতিতে প্রশাসনই শুধু গ্রামের মানুষের কাছে যায়নি- উন্নয়নের জিয়নকাঠি চলে গিয়েছিলো গ্রামে। জনগণের দোড় গোড়ায় বিচার ব্যবস্থা পৌঁছে গেছে। তাঁর ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় গ্রামে গ্রামে রাস্তাঘাট, পুল, কালভার্ট, দালান-কোঠা নির্মানের ফলে ৬৮ হাজার গ্রাম লাভ করেছে শহরের আমেজ। পল্লী বিদ্যুতায়ন কর্মসূচী গ্রামকে করেছেন বিদ্যুতায়িত। ২১টি জেলা ভেঙ্গে ৬৪টি জেলা করেছেন। বৃটিশ আমলের সেই মহকুমাগুলো এখন পূর্ণাঙ্গ জেলা হিসেবে দেশবাসীর কাছে পরিচিত হয়েছে। জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান পদ সৃষ্টি করে প্রশাসনে গণপ্রতিনিধিদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছেন। ইউনিয়ন পরিষদকে শক্তিশালী করেছেন। তিনি ইউনিয়ন পরিষদের মেয়াদকাল ৩ বছর থেকে ৫ বছরে উন্নিত করেছেন। শিক্ষা ব্যবস্থাকেও তিনি চেষ্টা করেছেন মানসম্মত করতে। তার সময়ে বাধ্যতামুলক প্রাথমিক শিক্ষা প্রবর্তন করেছেন। গ্রামের মেয়েদের জন্য অষ্টম শ্রেনী পর্যন্ত বিনা বেতনে লেখাপড়ার ব্যবস্থা করেছেন। সারা দেশে শতাধিক কলেজ এবং দেড় শতাধিক স্কুল সরকারিকরণ করেছেন। খুলনা, সিলেট এবং কৃষ্টিয়ায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছেন। দিনাজপুরে হাজী দানেশের নামে একটি কৃষি কলেজ করেছেন। বেসরকারী স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার শিক্ষকদের জন্য সরকারি অনুদান ৩০ ভাগ থেকে বৃদ্ধি করে ৭০ ভাগ করেছেন। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের জন্য কয়েক কোটি টাকার অনুদান দিয়েছেন। বিভিন্ন কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন ছাত্রাবাস নির্মাণ এবং ছাত্র-শিক্ষকদের জন্য কয়েক কোটি টাকার অনুদান দিয়েছেন। বিভিন্ন কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন ছাত্রাবাস নির্মাণ এবং ছাত্র-শিক্ষকদের যাতায়াতের জন্য গাড়ি দান করেছেন। একই সাথে যোগাযোগ ব্যবস্থায়ও তিনি নির্মাণ করেছিলেন সততার উদাহরণ- অসংখ্য রাস্তা, পুল, সেতু, কালভার্ট নির্মাণ করেছেন, যা এ দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থায় এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হবে। তিনি প্রায় ১০ হাজার কিলোমিটার রাস্তা পাকা করেছেন এবং ১, ৫০০টি ছোট বড় সেতু নির্মাণ করেছেন। মহানন্দা, ঘাঘট আর নাগর নদীতে সেতু নির্মাণ করেছেন। তিনি নির্মাণ করেছেন মেঘনা সেতু, কর্ণফুলী সেতু, বুড়িগঙ্গা সেতু, রামপুরা সেতু, টঙ্গী সেতু, টেকেরহাট সেতু, শম্ভুগঞ্জ সেতু, কামার খালী সেতু, বান্দরবনে সাংগু সেতু, প গড় সেতু, সিলেটে শাহজালাল-লামা কাজী সেতুসহ, অসংখ্য সেতু এবং যমুনা বহুমূখী সেতু বাস্তবায়নের যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহন করেছিলেন। রাজধানীকে যানজট মুক্ত রাখার জন্য করেছেন রোকেয়া সরণী, প্রগতি সরণী, মুক্তি সরণী, বিজয় সরণী, পান্থপথ, জনপথ, নর্থ সাউথ রোড, সোনারগাঁ রোড, লিংক রোডসহ অসংখ্য রাস্তা। রাজধানিতে একমাত্র ফুলবাড়িয়া বাস স্ট্যান্ড থেকে ৩টি বড় বাস স্ট্যান্ড তৈরী করেছেন। যেমন- সায়দাবাদ, মহাখালী ও গাবতলী। ৬০০ কোটি টাকা ব্যায়ে ৯০ ফুট প্রশস্ত নগরবাড়ী-রংপুর এবং পল্লীবন্ধু দিনাজপুর-প গড় সড়ক নির্মাণ করেছেন। দেশের সর্ববৃহৎ যমুনা সেতুর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করে এর কাজ শুরুর পরিকল্পনা এবং প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। ৪টি ডিসি-১০ বিমান ক্রয় করে অত্যন্ত নাজুক অবস্থা থেকে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বিমানকে স¤প্রসারিত করেছেন। অভ্যন্তরীন বিমান ব্যবস্থায় ২টি এটিপি ক্রয় এরশাদের আরেকটি উল্লেখযোগ্য সংযোজন। আন্তঃনগর ট্রেন ব্যবস্থা চালু করে রেল যোগাযোগ ব্যবস্থায় এক উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছন। ডিজিটাল সিষ্টেমসহ দেশে বিদেশে সরাসরি টেলিযোগাযোগে আধুনিকায়নের সূচনা করেছেন। ক্ষমতা গ্রহণের পূর্বে বিদ্যুতের উৎপাদন ছিলো মাত্র ৬৫০ মেগাওয়াট। তিনি মতা ছেড়ে দেয়ার আগে সেই বিদ্যুতের উৎপাদ ২২০০ মেগাওয়াটে উন্নিতি হয়। তিনি স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় অন্য আর ১০ টা দেশের চেয়ে অনেক বেশি উন্নয়ন সাধন করেছিলেন তৎকালিন সময়ে। তাঁর প্রমাণ-যুগান্তকারী ঔষধ নীতি প্রবর্তন করে শুধু বাংলাদেশের নয়, সারা দেশের সচেতন মানুষের মোবারকবাদ পেয়েছেন।

জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার রোধের কার্যকর পদক্ষেপ এবং অবদানের জন্য আন্তর্জাতিক পুরষ্কার “জাতিসংঘ জনসংখ্যা পুরষ্কার” লাভ করেন। শেরেবাংলা নগরে হার্ট ইন্সটিটিউট স্থাপন করেছেন। ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়ে সরকারি হাসপাতালের শয্যা সংখ্যা ২৩, ৮৭০টিতে উন্নিত করেন। অথচ ক্ষমতা গ্রহণের সময় তা ছিলো ১৬, ১৭১টি। শ্রমিক শ্রেনীর মানুষের জন্য তৈরী করেছেন শ্রমজীবী হাসপাতাল। উন্নয়ন কথায় নয়; কাজে প্রমাণ করেছিলেন নিবেদিত এই দেশপ্রেমিক। যে কারণে তাঁর শাসনামলে খাদ্য উৎপাদনে ব্যপক অগ্রগতি হয় আমাদের। ক্ষমতা ছেড়ে দেয়ার সময় খাদ্য উৎপাদনের পরিমান ছিলো ১ কোটি ৯৫ লক্ষ টন। আর ক্ষমতা গ্রহণের পূর্বে খাদ্য উৎপাদন ছিলো ১ কোটি ৪২ লক্ষ টন। খাদ্য উৎপাদনে যে কার্যক্রম শুরু করেছিলেন এতে ১৯৯২ সনে দেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের নির্ধারিত লক্ষ্য মাত্রা অর্জন করতো। কৃষি কাজে ব্যবহৃত সারের পরিমান ছিলো ২২ ল ৬২ হাজার টন। অথচ ক্ষমতা গ্রহণের পূর্বে এর পরিমান ছিলো মাত্র ৯ লক্ষ ৭০ হাজার টন। ধর্মীয়ভাবেও বাংলাদেশের রাজনীতিতে ষড়যন্ত্রেও শিকার এরশাদ এগিয়ে ছিলেন অন্যদের চেয়ে। যে কারনে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম ঘোষনা করে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিয়েছেন। রেডিও-টিভিতে আজান প্রচারের পদক্ষেপ নিয়েছেন। বায়তুল মোকাররম মসজিদের নব-রূপায়ন এবং সংষ্কার করেছেন। হিন্দুদের পবিত্র তীর্থস্থান লাঙ্গলবন্দে ৫০ লক্ষ টাকা খরচ করে ঘাট তৈরী করেছেন। পানি এবং অন্যান্য সুযোগ সুবিধাসহ বিশ্রাম করে জন্য সেড তৈরী করেছেন। রাজধানীতে তিনি নতুন মসজিদ করেছেন ৬টি। গুলশানে হযরত আব্দুল কাদের জিলানী (রাঃ) মসজিদ, গোলাপশাহ মসজিদ, নিউ মার্কেট মসজিদ, সাভার মসজিদ, পিডব্লিউডি মসজিদ এবং বেইলী রোড অফিসার্স কলোনী মসজিদ। এছাড়া কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে সংষ্কার করেছেন লালবাগ শাহী মসজিদ, বেগমবাজার মসজিদ, তারা মসজিদ, সাত গম্বুজ মসজিদ, ডিআইটি মসজিদ সহ সারা দেশের অসংখ্য মসজিদ। হাইকোর্টের সামনে পুকুর ভরাট করে তৈরী করেছেন প্রথম জাতীয় ঈদগাহ। সকল মসজিদ, মন্দির, গীর্জা এবং বৌদ্ধ মঠের পানি ও বিদ্যুৎ বিল স্থায়ীভাবে মওকুফ করেছেন। জন্মাষ্টমীর দিন জাতীয় ছুটি ঘোষনা করেছেন। তিনিই গঠন করেছেন হিন্দু ধর্মীয় কল্যান ট্রাষ্ট এবং বৌদ্ধ ধর্মীয় কল্যান ট্রাষ্ট। শ্রমিকবান্ধব এরশাদ সরকারি কর্মচারী ও শিল্প শ্রমিকদের বেতন-ভাতা দ্বিগুন করেছেন। এমনকি তিনি সর্বনিম্ন বেতনও দ্বিগুন করেছেন। প্রতি ঈদে এক মাসের বেতনের সমপরিমান বোনাস প্রবর্তন করেছেন। শ্রমিকদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধির জন্য মঞ্জুরী কমিশন এবং কর্মচারীদের জন্য বেতন কমিশন গঠন করেছেন। বেতনের শতকরা ৮০ ভাগ পেনশন নির্ধারণ করেছেন। যার পরিমান পূর্বে ছিলো সর্বোচ্চ ৫, ০০০ টাকা। শ্রমিকদের জন্য কালাকানুন বলে খ্যাত ’৬৯-এর শিল্প-সম্পর্ক অধ্যাদেশ বাতিল করেছেন এবং যুগোপযোগী শ্রম আইন প্রবর্তন করেছেন। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা রক্ষায় পল্লীবন্ধু এরশাদ ব্যপক কাজ করেছেন বলে বিভিন্ন তথ্য রয়েছে। বিশেষ করে- মুক্তিযোদ্ধাদের অস্তিত্ব যখন নিজস্ব স্বাধীন মাটিতে বিপন্ন তখন পল্লীবন্ধু হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ অভয় বাণী নিয়ে তাদের অভিভাবকরূপে পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন। বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে তিনিই প্রথম উচ্চারণ করেন “মুক্তিযোদ্ধারা এ জাতির সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সন্তান”। তিনি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও লাখো শহীদের স্মৃতি সংবলিত সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধের অসমাপ্ত কাজসমূহ সমাপ্ত এবং তার সৌন্দর্য বৃদ্ধি করেন। মুক্তিযুদ্ধের মরণোত্তর সর্বোচ্চ বীরশ্রেষ্ঠ খেতাবপ্রাপ্ত সাতজন শহীদের প্রত্যেক পরিবারবর্গের জন্য একটি করে সুসজ্জিত পাকা আবাসিক বাড়ি তৈরি করে দেন।

বীরশ্রেষ্ঠ খেতাবপ্রাপ্ত সাতজন শহীদের নামে বিশেষ স্মরণীয় ডাকটিকেট ও উদ্বোধনী খাম প্রকাশ করা হয়। শহীদ মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের পুনর্বাসনের জন্য প্রতিষ্ঠিত মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের পরিচালিত ২২টি শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের চিরস্থায়ী মালিকানা বিনামূল্যে কল্যাণ ট্রাস্টকে প্রদান করা হয়। মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট-এর প্রধান কার্যালয়ের জন্য নিজস্ব কোনো ভবন না থাকায় মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকায় একটি বহুতল ভবন কল্যাণ ট্রাস্টকে বিনা মূল্যে প্রদান করা হয়, যার নামকরণ করা হয়েছে “স্বাধীনতা ভবন”। তিনি শহীদ সোহারাওয়ার্দী হাসপাতালের নিকট যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য অস্থায়ীভাবে ব্যবহৃত দু’টি পাকা ভবনের মালিকানা স্থায়ীভাবে বরাদ্দ করে দেন। শহীদ মুক্তিযোদ্ধা পরিবার ও যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের পুনর্বাসন ও আবাসগৃহের জন্য মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স ফান্ড কার্যকরভাবে পুনর্গঠন করা হয় এরশাদের আমলেই। তিনি মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান করমুক্ত ঘোষণা করেন। সারাদেশে শহীদ মুক্তিযোদ্ধা পরিবার, যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা, দুস্থ ও নিঃস্ব মুক্তিযোদ্ধাসহ সকল মুক্তিযোদ্ধাকে মুক্তিযোদ্ধা সংসদের মাধ্যমে সংগঠিত করে তাদের অসুবিধাসমূহ দূরীকরণসহ পুনর্বাসনের জন্য সর্বাত্মক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়। এর ফলে বাংলাদেশের সর্বত্র মুক্তিযোদ্ধাদের নিজস্ব সংগঠন, মুক্তিযোদ্ধা সংসদের নিজস্ব শাখা ও কার্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। মুক্তিযোদ্ধা সংসদের ৬৪টি জেলা হেডকোয়ার্টারে স্থায়ী কার্যালয় নির্মাণের জন্য মাত্র ১০১ টাকা টোকেন মূল্যে ৫ কাঠা করে জমি বরাদ্দ করেন। মুক্তিযোদ্ধা সংসদের প্রতিটি জেলা হেডকোয়ার্টারের কার্যালয় ভবন নির্মাণের জন্য প্রথম কিস্তি হিসেবে এক কোটি টাকা প্রদান করা হয়। তালিকাভুক্ত শহীদ মুক্তিযোদ্ধা পরিবার, যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতা পূর্বের তুলনায় বহুগুণে বৃদ্ধি করা হয় এবং সরকারি তহবিল থেকেও বিশেষ বাজেট বরাদ্দ করা হয়। বিগত সরকারসমূহের আমলে ষড়যন্ত্রমূলক মামলাসহ বিভিন্ন মামলায় শাস্তিপ্রাপ্ত ও আটককৃত প্রায় এক হাজার মুক্তিযোদ্ধার শাস্তি হ্রাস ও সম্পূর্ণ মওকুফ করে মুক্তি দেয়া হয়। এদের মধ্যে অনেক ফাঁসি ও যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্তেরও শাস্তি মওকুফ করা হয়। প্রকৃত যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের সরকারি বাস, ট্রেন ও বিমানে বিনামূল্যে ভ্রমণের জন্য বিশেষ পরিচয়পত্র প্রদান করা হয়। মুক্তিযোদ্ধাদের স্বাধীনতা যুদ্ধে ঐতিহাসিক অবদানের জন্য তাদের স্বীকৃত ও সম্মানিত ব্যক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে সরকারি উদ্যোগে শহীদ মুক্তিযোদ্ধা, যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাসহ সকল মুক্তিযোদ্ধার তালিকা প্রণয়নের কাজ সমাপ্ত করা হয়। পল্লীবন্ধু এইচ এম এরশাদই মুক্তিযোদ্ধাদের একক ও দলবদ্ধভাবে অর্থনৈতিক পুনর্বাসনের জন্য সহস্রাধিক ছোটবড় প্রকল্প করেছিলেন। পল্লীবন্ধু এরশাদের শাসনামলে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশাসনিক ও সামাজিক কার্যক্রমে বিশেষভাবে অংশগ্রহণের সুযোগ প্রদানের লক্ষ্যে প্রতিটি উপজেলা পরিষদে একজন করে মুক্তিযোদ্ধাকে রাষ্ট্রপতি কর্তৃক মনোনয়ন দেয়া হয় এবং প্রতিটি ইউনিয়নে, পৌরসভাসহ অন্যান্য পরিষদে ও স্থানীয় এবং জাতীয় পর্যায়ে মুক্তিযোদ্ধাদের একজন করে প্রতিনিধি দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

পল্লীবন্ধু এরশাদের শাসনামলে প্রতিবছর পবিত্র হজ্ব পালনের জন্য মুক্তিযোদ্ধা সংসদের মাধ্যমে ৩ জন করে মুক্তিযোদ্ধাকে সরকারি হজ্ব ডেলিগেশন টিমে সদস্য হিসেবে মনোনয়ন দেয়ার ব্যবস্থা করা হয়। মুক্তিযোদ্ধা সংসদের চেয়ারম্যানকে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিনিধি হিসেবে বিশেষ রাষ্ট্রীয় সম্মান প্রদর্শনের লক্ষ্যে মন্ত্রীর মর্যাদায় রাষ্ট্রপতির উপদেষ্টা হিসেবে নিযুক্ত করার বিধান চালু করা হয় পল্লীবন্ধু এরশাদের আমলেই। মুক্তিযুদ্ধের প্রেরণার উৎস ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনে অমর শহীদদের স্মরণে স্থাপিত শহীদ স্মৃতিসৌধটিকে সম্পূর্ণ নতুন আঙ্গিকে সুসজ্জিতকরণসহ সমুদয় কাজ সম্পূর্ণ করেন। ভাষা আন্দোলনের বীর শহীদদের প্রত্যেককে ১টি করে পাকাবাড়ী নির্মান করে দেন পল্লীবন্ধু এইচ এম এরশাদ। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সকলের মনে অনুপ্রাণিত করার লক্ষ্যে তিনি প্রতিদিন বাংলাদেশ টেলিভিশনে সংবাদ প্রচারের পূর্বে জাতীয় শহীদ স্মৃতিসৌধ প্রদর্শন ও মুক্তিযুদ্ধের গান প্রচারের ব্যবস্থা করেন, যা এখনো অব্যাহত রয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সকলকে অনুপ্রাণিত করার লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নামে মুক্তিযুদ্ধের সময় মেহেরপুরের আম্রকাননে প্রতিষ্ঠিত মুজিবনগরকে রাষ্ট্রীয়ভাবে যথাযথ সম্মান ও মর্যাদা প্রদর্শনের জন্য রাষ্ট্রপতি হিসেবে তিনিই প্রথম ভ্রমণ করেন ও সেখানে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় রাষ্ট্রপতি কর্তৃক মুজিবনগর স্মৃতিসৌধ ও আনুষঙ্গিক কার্যক্রম সম্পূর্ণ করা হয়। মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক বঙ্গবীর জেনারেল এম এ জি ওসমানী স্মরণে ঢাকায় ওসমানী উদ্যান, ওসমানী মিউজিয়াম, আন্তর্জাতিক মানের ওসমানী স্মৃতি মিলানায়তন তৈরি ও সিলেট বিমানবন্দরকে ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নামকরণ করা হয় এবং সিলেটে জেঃ ওসমানীর বাড়িটিকে মিউজিয়ামে রূপান্তরিত করা হয়। মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক বঙ্গবীর জেনারেল এম এ জি ওসমানী স্মরণে বিশেষ ডাকটিকেট, উদ্বোধনী খাম প্রকাশ করা হয়। শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের স্মৃতি অমর করার লক্ষ্যে বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় সরকারি উদ্যোগে সহস্রাধিক রাস্তাঘাট ও ভবনের নামকরণ করা হয়। পল্লীবন্ধু এরশাদ মুক্তিযোদ্ধাদের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের জন্য ঢাকার ইস্কাটনে প্রয়োজনীয় জায়গাসহ একটি দ্বিতল ভবন স্থায়ীভাবে বরাদ্দ করেন। পল্লীবন্ধু এরশাদের শাসনামলে মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিলের বহুতল ভবনের জন্য কাকরাইলের নিকট একটি জমি টোকেন মূল্যে বরাদ্দ করা হয়। তাঁর শাসনামলে প্রশিণপ্রাপ্ত সহস্রাধিক মুক্তিযোদ্ধাকে সরকারি উদ্যোগে বিদেশে প্রেরণ করা হয়। বেকার মুক্তিযোদ্ধাদের পুনর্বাসনের লক্ষ্যে কারিগরি প্রশিক্ষণ প্রদান ও চাকরির ক্ষেত্রে ৩০% কোটা যথাযথ পালন করা কার্যকরি ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। মুক্তিযোদ্ধাদের চাকরির ক্ষেত্রে ৩০ বছর থেকে ৩২ বছর পর্যন্ত বর্ধিত করা হয়। সহস্রাধিক ভূমিহীন মুক্তিযোদ্ধাকে সরকারি খাস জমি, পুকুর, জলাশয় ও পতিত জমি বরাদ্দ করা হয়। মুক্তিযোদ্ধা পরিবার ও যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের ব্যবহৃত পরিত্যক্ত বাড়ি-ঘর বিশেষ ব্যবস্থায় সরকার নির্ধারিত স্বপ্ল মূল্যে দীর্ঘ মেয়াদে ২৫ কিস্তিতে বিক্রি করা হয়। মুক্তিযোদ্ধাদের ভাবমূর্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে জাতীয় পর্যায়ে মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ক্রীড়াচক্র প্রতিষ্ঠা করা হয়। ক্রীড়াচক্রের স্থায়ী কার্যালয়ের জন্য বঙ্গবীর জেনারেল ওসমানী উদ্যানে নিজস্ব ভবন ও জমি দান করা হয়।

কাজের এমন বর্ণনা দিতে চাইলে অনেক দেয়া যাবে। কিন্তু তাতে কোন লাভ হবে না। তাই আর বর্ণনা দিচ্ছি না। শুধু বলছি- এরশাদকে ভালো বলুন আর মন্দ বলুন, তাতে কিছু যায় আসে না। ভালো ছিলেন কি না বলুন। যতদূর জেনেছি- তাঁর শাসনামলে দেশের সাধারণ মানুষ দু'বেলা দু’মুটো খেয়ে পরে সচ্ছন্দে জীবন যাপন করতে পেরেছে। কারণ তখন মানুষের হাতে অর্থের সংস্থান ছিলো। দেশে ব্যাপক উন্নয়ন কর্মকান্ডের জন্য সাধারণ মানুষের কাজের সুযোগ ছিলো। মানুষের ক্রয় ক্ষমতা ছিলো। নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের মূল্য অতি সাধারণ মানুষের ক্রয় ক্ষমতার আওতার মধ্যে ছিলো। এরশাদের আমলে নিত্য প্রয়োজনীয় কিছু জিনিসের মূল্য কত ছিলো জেনে অবাকও হতে পারে নতুন প্রজন্ম- চাউল ১ কেজি ৬ টাকা, আটা ১ কেজি ৬ টাকা, ময়দা ১ কেজি ৭ টাকা, মসুরির ডাল ১ কেজি ১৮ টাকা, সয়াবিন তেল ১ কেজি ২৪ টাকা, পেয়াঁজ ১ কেজি ৪ টাকা সহ প্রায় সকল পন্যই ছিলো হাওে নাগালে। এমন একজন নিবেদিত রাষ্ট্রপ্রধানের জন্য নতুন প্রজন্মের রাজনীতিক হিসেবে বিনয়-শ্রদ্ধা আর ভালোবাসাা জানাতেই পারি। আর তার পাশাপাশি বলতেও পারি তাঁর সাথে অন্যায় হয়েছে, অ-নে-ক অন্যায়। যারা অন্যায় করেছেন, যিনি অন্যায় করেছেন; বাস্তবতা হলো- কেউ ভালো নেই।

জাতীয় পার্টির (জাপা) চেয়ারম্যান এবং সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ-এর চলে যাওয়ার দিন অর্থাৎ ১৪ জুলাই কেবলই মনে হয়েছে- আমরা দেশের একজন নিবেদিত মানুষ হারালাম, হারালাম অভিভাবকও। ১৯৩০ সালের ১ ফেব্রয়ারী তিনি রংপুর জেলার দিনহাটায় জন্মগ্রহণকারী রাষ্ট্রপতি এরশাদের কবিা দিয়েই শেষ করবো-

‘আলোকিত দিনের প্রতীক্ষায়’ শীর্ষক কবিতায় তিনি লিখেছেন-

একটি আলোকিত দিনের প্রতীক্ষায়

আমার প্রতিদিন কেটে যায় উদাসীন

পথিকের মতো পথপানে চেয়ে চেয়ে।

অন্ধকার পৃথিবীতে দিকভ্রান্ত দিশেহারা

মোমিন মেহেদী: চেয়ারম্যান, নতুনধারা বাংলাদেশ এনডিবি


  • পড়া হয়েছেঃ ৭৮ বার
  • প্রকাশিতঃ সোমবার, ২২ জুলাই ২০১৯

সর্বশেষ প্রকাশিত