শিশুর ঘাড়ে ব্যাগের বোঝা চাপিয়ে দিলে হবে না

শিশুর ঘাড়ে ব্যাগের বোঝা চাপিয়ে দিলে হবে না

মোহাম্মদ মন্‌জুরুল আলম চৌধুরী

সোমবার, ২২ জুলাই ২০১৯


শিশুর কাঁধে ব্যাগ

আমাদের আজকের শিশুরা এদেশের ভবিষ্যৎ কান্ডারী। সাধারণত এবং জাতিসংঘের শিশু অধিকার কনভেনশন অনুযায়ী ১৮ বছরের নিচে সব মানুষই শিশু হিসেবে বিবেচিত। শিশুদের বিদ্যা বুদ্ধি মেধা জ্ঞান আহরণের পরিবেশ প্রদানের পাশাপাশি তাদের মননশীলতা সৃষ্টিশীলতা খেলাধুলা শারীরিক সুস্থতার দিকেও আমাদের মনোযোগী হওয়া উচিৎ। শিশুদের ব্যক্তিত্ব, মুক্ত বুদ্ধি চিন্তা চেতনার বিকাশ প্রকাশ ঘটানোর জন্য, স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধি, সামাজিক সচেতনতা ও দায়বদ্ধতার মাধ্যমে দক্ষতা অর্জনের জন্য স্কুলের নির্দিষ্ট একাডেমিক শিক্ষার নানান মুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করার পাশাপাশি খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড যেমন নাচ, গান, ছবি আঁকা, নাটক, আবৃত্তি, গল্প বলা, বিতর্ক প্রতিযোগীতা, বিভিন্ন জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ দিবসে বক্তৃতা ও আলোচনা করা ইত্যাদি, সামাজিক কর্মকাণ্ড যেমন মানবিক ও নৈতিক গুণাবলীর চর্চা, দরিদ্র ও পথশিশুদের আর্থিক সাহায্য এবং দরিদ্র এবং অসহায় মানুষকে বিভিন্ন ধরণের সহায়তা দান, শীতকালে বা বন্যাদুর্গত এলাকায় খাদ্য, বস্ত্র ও আর্থিক দান, বৃক্ষরোপণ কর্মসূচীপালন ও বাগান করা এবং রাস্তার ধারে বা বিভিন্ন পতিত স্থানে গাছ লাগানো, শিশু সমাবেশ, নিরক্ষরদের পাঠদান, ধর্মীয় শিক্ষার সাথে ধর্মীয় রীতিনীতি ও আচার অনুষ্ঠান শিক্ষা ও প্রতিযোগীতার আয়োজন করা, ফার্স্ট এইড শিক্ষা, শিশু অধিকার নিয়ে সচেতনতা সৃষ্টি করা দেশ ও জাতির নৈতিক দায়িত্ব ও কর্তব্য। দেশের প্রতিটি শিশুকে স্কুলে পাঠানো, শিক্ষা দান সুনিশ্চিত করার পাশাপাশি শিশুশ্রমও বন্ধ করাও জরুরী। পাশাপাশি বিরত রাখতে হবে ঝুঁকিপূর্ণ ওয়েল্ডিং, চামড়া শিল্প, নির্মাণকাজ সহ বিভিন্ন কাজকর্ম থেকেও।

এক তথ্য থেকে জানা যায়, “১৯৮৯ সালের ২০ নভেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ শিশু অধিকার বিষয়ে একটি কনভেনশন বা সনদ গ্রহণ করে। ওই সনদের সূচনায় বলা হয়- ১. শৈশবে শিশুদের প্রদান করতে হবে বিশেষ যত্ন ও সহায়তা; ২. শিশুর ব্যক্তিত্ব বিকাশ ও সাবলীল উন্নয়নের জন্য তাকে পারিবারিক পরিবেশে লালন-পালন করতে হবে এবং পরিবারে থাকতে হবে শান্তি, ভালোবাসা ও পারস্পরিক সহযোগিতা; ৩. জন্মের আগে ও পরে শিশুর প্রয়োজন আইনানুগ ও বিশেষ নিরাপত্তা এবং যত্ন; ৪. বিশ্বের অনেক দেশে অনেক শিশু খুবই কঠিন অবস্থায় রয়েছে, তাদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থার প্রয়োজন”। এর প্রেক্ষিতে জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে বাংলাদেশে শিশু অধিকার আইন, ২০১৩ সংসদে গৃহীত হয়েছে। এ আইনে নয় বছরের কম বয়সের শিশুকে গ্রেফতার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। বর্তমান সরকার শিশুদের শিক্ষা বাধ্যতামূলক করেছে। বছরের প্রথম দিনেই শিক্ষার্থীদের হাতে নতুন বই তুলে দিচ্ছে যা শিক্ষার্থীদেরকে আনন্দিত এবং শিক্ষায় যে উদ্বুদ্ধ করছে তা বলাই বাহুল্য। শিক্ষার্থীদের জন্য সরকার অনেক ধরণের সুযোগ সুবিধা প্রদান করলেও প্রাথমিকের পর থেকে ধীরে ধীরে শিশুদের ঝরে পড়ার সংখ্যাও নেহায়েত কম নয়।

বর্তমানে আমাদের শিশুরা কি তাদের বেড়ে উঠার জন্য জাতিসংঘের কনভেনশন এবং আমাদের দেশের আইন কানুন অনযায়ী তাদের জন্য প্রযোজ্য শিশু অধিকার, সুযোগ সুবিধাগুলো কি আদৌ পাচ্ছে ?যদি পেয়ে থাকে তবে কতটুকুই বা পাচ্ছে? সহজ সরল উত্তর হচ্ছে একটি বিরাট না। বরং আমরা শিশুদের ঘাড়ে বইয়ের বিরাট বোঝার এক একটি ব্যাগ তুলে দিয়েছি। শ্রেণী অনুযায়ী তাদের পড়ার বিষয় এবং বইয়ের ছড়াছড়ি। শিশুরা বইয়ের আর পড়ার ভারে নুইয়ে পড়ছে। কিন্তু সেদিকে কারো খুব একটা নজর আছে বলে মনে হয়না। কিন্ডারগার্টেন থেকে শুরু করে বিভিন্ন ইংরেজী মিডিয়ামের শিশুদেরকে তাদের মস্তিষ্কের ধারণ ক্ষমতার অতিরিক্ত পাঠ্যপুস্তক দেয়া হয়েছে। একটি দালান কোঠা আর কয়েকজন শিক্ষক হলেই কিন্তু একটি স্কুল খুলে দারুণ শিক্ষা ধান্ধায় আপনিও নেমে যেতে পারেন নির্দ্বিধায়। প্রফিট নিয়ে কোন চিন্তা নেই। নেই টেনশন। বরং নিশ্চিন্তে বিভিন্ন উপায়ে শতভাগ লাভ এখানে। শিক্ষা এখন মৌলিক অধিকার বা বিষয় নয় যেন একটি বাণিজ্যে পরিণত হয়েছে। ফলে অলিতে গলিতে পর্যন্ত স্কুলসহ অন্যান্য শিক্ষালয় ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে উঠছে। আগে বিরাট বিশাল খেলার মাঠ ছাড়া কি স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় চিন্তা করা যেত। নিজস্ব ব্যায়ামগার, কমনরুম, লাইব্রেরী সহ বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা তো অবশ্যই থাকতে হতো। সেই বিরাট মাঠে জাতীয় পতাকা উত্তোলনের পাশপাশি জাতীয় সঙ্গীত গাওয়ার জন্য এসেম্বলি শিক্ষার্থীদের জন্য ছিল বাধ্যতামূলক। তাছাড়া মাঠে শরীরচর্চার ক্লাস হতো। হতো বিভিন্ন শারীরিক কসরত এবং খেলাধুলা। এসব বিষয় খুব কড়াকড়িভাবে পালন করা হতো। এখন সেই মাঠ কোথায় আর জাতীয় সঙ্গীত গাওয়া বা কোথায়। শিশুরা যে খেলাধুলা করবে তার জন্য তো মাঠই নেই। নেই ইনডোর গেইমসের ব্যবস্থা। বিভিন্ন স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে আন্তঃস্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে খেলাধুলার প্রতিযোগীতার সেই প্রচলন এখন আর দেখা যায়না। বরং তা উঠে গেছে বলাই ভালো। শিশুদের মননশীলতা প্রকাশের জন্য দেয়ালিকা প্রকাশ, বার্ষিক ম্যাগাজিন প্রকাশ, বিভিন্ন জাতীয় অনুষ্ঠানগুলোতে সাংস্কৃতিক প্রতিযোগীতা, বক্তৃতা প্রতিযোগীতা, ধর্মীয় দিবসে ক্বেরাত, হামদ নাত প্রতিযোগীতা কয়টি শিক্ষালয়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে তা আমরা জানিনা। তবে আশার বিষয় হচ্ছে বর্তমান সরকার জাতীয় দিবসগুলো যথাযোগ্য মর্যাদা ও গুরুত্বের সাথে পালনের জন্য যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়েছেন এবং এ বিষয়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর কড়াকড়ি আরোপ করেছেন যা আমাদের আগামী প্রজন্মের কাছে দেশের ঐতিহ্য, ইতিহাস জানা এবং তাদের মাঝে দেশাত্ববোধ তৈরিতে অবদান রাখবে এটিই জাতির প্রত্যাশা।

শিশুদের ভুরি ভুরি বইপত্র আর লেখাপড়া দিয়ে তাদের মনোজগতে এতো মানসিক চাপ সৃষ্টি করা হয়েছে যে সে ঘরে লেখাপড়া শেষ করে বাইরে কিছুক্ষণ যে খেলাধুলা করবে সে সময়টুকু বের করা খুব কষ্টসাধ্য হয়ে উঠেছে। আবার আমরা আমাদের ছেলেমেয়েদের খেলাধুলার জন্য একটি মাঠও রাখিনি। সব দখল হয়ে গেছে। সাতার শিখবে তার জন্যে এলাকায় একটি, দীঘি, জলাশয় বা পুকুরও রাখিনি। নদীতে যাবে তা দখল হয়ে ভরাট হয়ে নাব্যতা হারিয়ে ফেলেছে। তাদের জন্য কোথাও কিছু নেই। অগত্যা কম্পিউটার, স্মার্ট ফোনে তারা গেইমস খেলছে, টিভিতে বিভিন্ন ভাষার কার্টুন দেখছে, হিন্দি টিভি চ্যানেলের কল্যাণে হিন্দি ভাষায় নির্মিত কার্টুন দেখে দেখে হিন্দি শিখে গেছে। অনেক মা বাবা বাংলার পরিবর্তে হিন্দী ভাষায় ছেলেমেয়েরা কথা বললে বেশ গর্ব বোধ করেন। আহা, বাঙ্গালীর চরিত্র বুঝা বড়ই কঠিন এবং দুষ্কর। এখনকার শিশুরা ফাস্ট ফুড খাচ্ছে, ঘরে বসে বসে টিভি দেখছে, কম্পিউটারে গেইমস খেলছে। এতে শিশুরা বিভিন্ন ধরণের রোগে আক্রান্ত হচ্ছে, তাদের দৃষ্টি শক্তি কমে যাচ্ছে, কাঁধে, ঘাড়ে, হাতে ব্যথা বেদনা হচ্ছে। নিজের চেয়েও ভারী ব্যাগ কাঁধে নিয়েও অনেকে বাথ ব্যাথায় ভুগছে। শিশু বয়সে অনেকে উচ্চ রক্তচাপ বৃদ্ধি এবং ডায়াবেটিসেও আক্রান্ত হচ্ছে, লিভার পেটি হয়ে যাচ্ছে। এভাবে যদি চলতে থাকে তবে দেশের শিশুদের জন্য অনেক কঠিন, জটিল, দুরারোগ্য রোগব্যাধি অপেক্ষা করছে বলে শিশু এবং অন্যান্য বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের অভিমত। সমাজবিজ্ঞানীরাও আমাদের শিশুদের বেড়ে উঠা নিয়ে শঙ্কিত। তাদের মনোজগতে উন্মুক্ত আগ্রাসী আকাশ সংস্কৃতির বিভিন্ন ধরণের কুপ্রভাব এবং বদভ্যাসের বিরূপ প্রভাব পড়বে বলে তাঁদের ধারণা। পাশাপাশি তাদের মধ্যে সামাজিক ও পারিবারিক বন্ধন আলগা হয়ে যেতে পারে বলেও আশঙ্কা। তারা শুধু নিজেদের ভুবনে বিচরণ করতে করতে নিজেদের ইতিহাস ঐতিহ্য ভুলে যেতে পারে। নিঃসঙ্গতা এবং একাকীত্ব তাদেরকে পরিবার থেকে দূরে ঠেলে দিতে পারে যা নেশা বা মাদকাসক্তির দিকে আকর্ষিত করতে পারে। তাই অনেকের পরামর্শ হচ্ছে ছুটির দিনে পরিবার পরিজন নিয়ে বাইরে ঘুরতে যাওয়া। লম্বা ছুটিতে দেশের বিভিন্ন স্থানে ঘুরে দেশের ঐতিহ্য, পুরাকৃতি, যাদুঘর, প্রত্নতাত্বিক নিদর্শন, স্মৃতিসৌধ, শহীদ মিনার সহ বিভিন্ন প্রসিদ্ধ জায়গা এবং স্থাপনা দেখে আসা। সমুদ্র সৈকত, রাঙ্গামাটি, বান্দরবান, ময়নামতি, সিলেট, খুলনা সহ দেশের বিভিন্ন প্রসিদ্ধ জায়গাগুলো পরিদর্শন এবং এসব বিষয়ে তাদেরকে জানানো এবং বুঝানো। আসুন শিশুদেরকে ফার্মের মুরগীর মতো ঘরে বন্দী করে না রেখে দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য, দেশজ ও লোকজ কৃষ্টি, সভ্যতা ও সংস্কৃতির সাথে পরিচয়ের পাশাপাশি দেশের অমর ভাষা শহীদ, মুক্তিযুদ্ধ, শহীদদের আত্মত্যাগ, মুক্তিযোদ্ধাদের এবং মা বোনদের অবদানের শৌর্য বীর্যের বীরত্ব গাঁথা তাদের অন্তরে পুঁতিত করার ব্যবস্থা নেই। দেশের ভবিষ্যৎ বংশধরদের সুন্দর ভবিষ্যৎ ধ্বংস করার অধিকার ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ, দেশ, জাতি এবং রাষ্ট্র করোরই নেই। শিশুদের সুন্দর সুস্থভাবে বেড়ে উঠার পরিবেশ তাদের জন্মগত অধিকার। এই অধিকার থেকে শিশুরা বঞ্চিত হলে ভবিষ্যৎ বংশধরেরা আমাদেরকে কখনোই ক্ষমা করবে না। ধন্যবাদান্তে,

মোহাম্মদ মনজুরুল আলম চৌধুরী।


  • পড়া হয়েছেঃ ১৩৪ বার
  • প্রকাশিতঃ সোমবার, ২২ জুলাই ২০১৯

সর্বশেষ প্রকাশিত