চট্টগ্রামে ডেঙ্গু প্রতিরোধে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া জরুরী

চট্টগ্রামে ডেঙ্গু প্রতিরোধে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া জরুরী

মোহাম্মদ মন্‌জুরুল আলম চৌধুরী

শনিবার, ২৭ জুলাই ২০১৯


ডেঙ্গু মশা

ডেঙ্গু পরিস্থিতি সারাদেশে মহামারীর আকার ধারণ করছে। চট্টগ্রামে ২৬ জুলাই’১৯ পর্যন্ত ৪৩ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর খবর পাওয়া গেছে। গত ২৬ জুলাই’১৯ এক দিনেই নতুন করে ৭ জনের শরীরে ডেংগু ধরা পড়েছে। আর জানুয়ারী ’১৯ থেকে সব মিলিয়ে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪৮ জনে। “এদিকে, জুলাই’১৯ মাসে চট্টগ্রামে হঠাৎ করে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়লেও এখনো রাজধানী ঢাকার মতো মহামারী বা আতঙ্কিত হওয়ার মতো পরিস্থিতি হয়নি বলে দাবী করেছেন সিভিল সারজন ডাঃ আজিজুর রহমান সিদ্দিকী”{সূত্রঃ আজাদী, ২৫ জুলাই’১৯}। পাশাপাশি ডেঙ্গু আক্রান্ত ব্যক্তিরা চিকিৎসা শেষে সবাই সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে গেছেন বলে জানান সিভিল সার্জন। তিনি আরও বলেন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে চট্টগ্রামে কোন রোগী মারা যাননি ঢাকার মতো তবে জুলাইয়ের ২য় এবং ৩য় সপ্তাহ থেকে চট্টগ্রামে ডেঙ্গুর প্রকোপ দৃশ্যমান হয়েছে। অন্যদিকে রাজধানীর ডেঙ্গু পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩২। হিমশিম খাওয়ার অবস্থা হাসপাতালে, ওয়ার্ডের বিছানা, মেঝে ও বারান্দায় রোগী এবং শিশুদের জায়গা হচ্ছে না সব হাসপাতালে। ডেঙ্গুর প্রকোপ বেড়ে যাওয়ার ফলে হাসপাতালে মানুষের ভীর বাড়ছে বলে জানা যায়। এবারের ডেঙ্গুতে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে আছে শিশুরা। “গত বছরও ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়েছে ১০ হাজার ১৪৮ জন, যার মধ্যে মারা গেছে ২৬ জন। এরপরও এ বছর তেমন কোনো প্রস্তুতি ছিল না। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রোগীদের স্বজনেরা বলেছেন, সিটি কর্পোরেশন লোকদেখানো মশা নিধন কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছে। আবার প্রস্ততির অভাবে এখন রোগীর চাপ সামলাতে পারছে না হাসপাতালগুলো” {সূত্রঃ প্র/ আলো, ২৫ জুলাই’১৯}। জানা যায়, অধিকাংশ হাসপাতাল ডেঙ্গু চিকিৎসায় আলাদা কোন টিম গঠন করতে পারেনি। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নার্সদের ডেঙ্গু বিষয়ে কোন প্রশিক্ষন না দেয়ার অভিযোগ রয়েছে। গত ২৫ জুলাই’১৯ তারিখে প্রকাশিত প্রথম আলো তাঁদের অনুসন্ধানে জানায়, এ পর্যন্ত ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত মোট ৩২ জনের মৃত্যুর ঘটনা জানা গেছে। এর মধ্যে সরকারি মেডিকেল কলেজে পাঁচটি ও স্বায়ত্বশাসিত হাসপাতালে দুটি মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। অবশ্য সরকারি হিসেবে মোট মৃতের ঘটনা ৫।

মশার হাত থেকে বাঁচার জন্য মানুষ এরোসল স্প্রে এবং গরীব দুঃখী অসহায় মানুষেরা মশার কয়েল ব্যবহার করে থাকে। দুঃখজনক খবর হচ্ছে কয়েলের বাজার ছাড়ছে বড় কোম্পানীগুলি। “কয়েক বছর আগেও দেশের মাশার কয়েলের বাজারে সবচেয়ে বেশি হিস্যা ছিল মরটিন ব্র্যান্ডের। কিন্তু এ ব্র্যান্ডের কয়েল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান রেকিট অ্যান্ড বেনকাইজার তাদের কারখানা বন্ধ করে দিয়েছে। উৎপাদন বন্ধ করেছে এ বাজারের আরেক শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান এসিআইও”। { সূত্রঃ প্র/ আলো, ২৪ জুলাই’১৯ }। জানা যায়, দেশে অবৈধ শত শত কারখানা ক্ষতিকর মাত্রার রাসায়নিক প্রয়োগ করে কয়েল উৎপাদন করে যা কমপ্লায়েন্ট বা সার্বিক মানসম্পন্ন কারখানাগুলো করতে পারেনা। কয়েল উতপাদনে কোন রাসায়নিক কী মাত্রায় প্রয়োগ করতে হবে, তার সুনির্দিষ্ট নীতিমালা আছে। কিন্তু অবৈধ এবং অখ্যাত কোম্পানিগুলো এসব কিছুর ধার ধারে না। তাঁরা মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকি এবং ক্ষতিকর হবে জানা সত্ত্বেও উচ্চমাত্রার বিভিন্ন রাসায়নিক প্রয়োগ করছে। এতে অতি দ্রুত মশা মারা যাচ্ছে ফলে মানুষ বাছবিচার না করেই মশা মরে এমন ভেজাল মশার কয়েল কিনছে ত্বরিত ফললাভের আশায়। কিন্তু মানসম্পন্ন কোম্পানিগুলোর মশার কয়েল জ্বালানোর সাথে সাথে মশা মরে না তবে তা কামড়াতে পারেনা এবং রাসায়নিকভাবে আক্রান্ত হয়ে এদিন ওদিক ঘুরে তবে মানুষের গা থেকে দূরে দূরে থাকে। ফলে মানুষের রক্ত চোষণ করার কার্যক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। দেশের অন্যান্য দ্রব্যের ভেজালের মতো মশার কয়েলেও ভেজালের বাতাস বইছে। খাদ্যে ভেজাল, পাস্তুরিত দুধে ভেজাল, ঔষধে ভেজাল। ভেজালের রাজত্ব দেশের সব সেক্টরে বিরাজমান। বিএসটিআই, ভেজাল খাদ্য অধিদপ্তর, সিটি কর্পোরেশন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখের সামনে কিভাবে শত শত অবৈধ ও অখ্যাত কোম্পানিগুলো মশার কয়েল উৎপাদন ব্যবসা পরিচালনা করছে তা কিছুতেই আমাদের বোধগম্য নয়। বিশেষজ্ঞদের মতে অনেক ধরনের কেমিক্যাল আছে যা প্রতি কে জি ছয় হাজার টাকা এসব ভেজালকারী কোম্পানিগুলো ব্যবহার করছে এক হাজার টাকা কে জি দরের ধানের পোকা মারার ঔষধ। এরকম অনেক প্রমাণ দেয়া যায়। ভেজাল বা নকল কয়েলগুলোতে যে উচ্চমাত্রার রাসায়নিক ব্যবহার করা হয় তাতে সংগে সংগে মশা মারা যায় কিন্তু মানুষের স্বাসপ্রশ্বাসের সাথে মানুষ যে রাসায়নিকের ধুঁয়া গ্রহণ করছে তা ধীরে ধীরে বিভিন্ন জটিল রোগে আক্রান্ত হয়ে মানুষের মৃত্যু ডেকে আনছে। হাঁফানি, শ্বাসতন্ত্র ও ফুসফুসসহ বিভিন্ন জটিল ও দুরারোগ্য রোগে মানুষের আক্রান্ত হওয়ার বিরাট ভয়াবহ ভয়ংকর ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে জনস্বাস্থ্য। দেশের সিটি কর্পোরেশন, বিএসটিআই, জেলা প্রশাসন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সহ সংশ্লিষ্ট সকলের মানব দেহের জন্যে দীর্ঘ মেয়াদে স্বাস্থ্যঝুঁকিপূর্ণ এবং মৃত্যতুর কারণের এসব অখ্যাত এবং অবৈধ কয়েলের কারখানা বন্ধে সাহসী উদ্যোগ গ্রহণ জরুরী।

জুলাই’১৯ মাসে বন্দরনগরী নগরী কয়েকবার পানির নিচে ছিল। সিডিএ’র মেগা প্রকল্পের কাজ শুরু করার পর থেকে চসিক তাঁদের নালা নর্দমা পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার রুটিন কাজ একরকম বন্ধ রাখে বলে অভিযোগে প্রকাশ। চসিকের মেয়র আর সিডিএ’র সাবেক চেয়ারম্যানের সাথে রাজনৈতিক দ্বন্ধ চট্টগ্রামের মানুষের কাছে অজানা নয়। এটি কোনো লুকোচুরির বিষয় ছিল না। এখানে ইগো কাজ করেছে বলে অনেকে মন্তব্য করেছেন। নগরবাসীর আশঙ্কা, উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠায় আছে যে ধীরে ধীরে শহরে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে পারে। চসিকের মশা নিধনে মশার ঔষধ ছিটানোর কাজও খুব একটা জোরালো মনে হচ্ছে না বা সব জায়গায় দৃশ্যমানও নয়। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্নস্থানে ডেঙ্গুর প্রকোপ যে হারে বাড়ছে তাতে হাসপাতালে রোগীর স্থান সঙ্কুলান হচ্ছে না সেখানে যদি চট্টগ্রামে ডেঙ্গু মহামারীর আকার ধারণ করে তবে তা জনস্বাস্থ্যের জন্য বিরাট ভয়াবহ ভয়ংকর হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। ঢাকায় ডেঙ্গু রোগের প্রকোপ বাড়ায় বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে ডেঙ্গু টেস্টের ফি প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। মাননীয় হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ এ ব্যাপারে যথাযথ ব্যবস্থা বা পদক্ষেপ নিতে সরকারকে নির্দেশ দিয়েছে। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় “চট্টগ্রামের সরকারি হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু টেস্ট করার সুযোগ নেই। চট্টগ্রামের বিশাল সংখ্যক মানুষের চিকিৎসাসেবায় একমাত্র ভরসাস্থল হিসেবে পরিচিত চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ ( চমেক ) হাপাতালেও নেই ডেংগু পরীক্ষার সুবিধা। চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালসহ সিটি কর্পোরেশনের অধিন ও অন্যান্য হাসপাতালেও একই চিত্র। হাসপাতাল সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে এ তথ্য পাওয়া গেছে”। { সূত্রঃ আজাদী, ২৭ জুলাই’১৯ }। যদিও সরকারি প্রতিষ্ঠানে ডেঙ্গু পরীক্ষার ফি ঢাকায় ২৫০ টাকা হলেও চট্টগ্রাম নগরীর নাম করা ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোতে ফি এক হাজার টাকার কম নয়। বরং কোনো কোনো ডায়াগনস্টিক এ ফি দেড় হাজার টাকারও বেশি। সংশ্লিষ্টরা জানান, সরকারের যথাযথ তদারকি না থাকায় ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলো উচ্চমূল্য নিয়ে থাকে। এ বিষয়ে চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসন, চসিক, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট সকল মহলের সজাগ এবং হুঁশিয়ার থাকার প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। যাতে ভুক্তভোগীদের বেশি ফি দিয়ে ডেঙ্গু রোগের রক্ত পরীক্ষা করতে না হয়। আশা করি সংশ্লিষ্ট সকলেই এ বিষয়ে আইনানুগ ব্যবস্থা নেবেন।

যেভাবে সারাদেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ বৃদ্ধি পাচ্ছে তাতে চট্টগ্রামের মানুষও নিরাপদ নয়। এটি যে কোন সময় চট্টগ্রামেও মহামারীর আকার ধারণ করতে পারে। এজন্য চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মশক নিধন কর্মসূচী জোরদার করার পাশাপাশি মানুষকেও সচেতন করার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে বলে সকলের ধারণা। তাই সরকারি এবং বেসরকারিভাবে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার জন্য চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসন, চসিক, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সহ সংশ্লিষ্ট সকলকে একটি সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা নিয়ে এগুতে হবে। জনসাধারণকে নিজেদের মধ্যে সচেতন হওয়ারও বিকল্প নেই। এ রোগ থেকে বাঁচার একমাত্র উপায় হলো ব্যক্তিগত সতর্কতা এবং এডিশ মশা প্রতিরোধ করা।

এক তথ্য থেকে জানা যায়, ঘরবাড়ি ও এর চারপাশে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকা ক্যান, টিনের কৌটা, মাটির পাত্র, বোতল, নারকেলের মালা ও এ-জাতীয় পানি ধারণ করতে পারে, এমন পাত্র ধ্বংস করে ফেলতে হবে, যেন পানি জমতে না পারে। গোসলখানায় বালতি, ড্রাম, প্লাস্টিক ও সিমেন্টের ট্যাঙ্ক কিংবা মাটির গর্তে চার-পাঁচ দিনের বেশি কোনো অবস্থাতেই পানি জমিয়ে রাখা যাবে না। পরিষ্কার ও স্থবির পানিতে ডেঙ্গুর জীবাণু বেশি জন্মায়। ঘরের আঙিনা, ফুলের টব, বারান্দা, বাথরুম, ফ্রিজের নিচে ও এসির নিচে জমানো পানি নিয়মিত পরিষ্কার করা, যাতে মশা বংশবৃদ্ধি করতে না পারে। আশা করি যথাযথ তদারকি এবং কর্মোদ্যোগের মাধ্যমে চট্টগ্রামের মানুষকে ডেঙ্গুর প্রকোপ থেকে বাঁচাতে সাহায্য করবে।


  • পড়া হয়েছেঃ ১১৮ বার
  • প্রকাশিতঃ শনিবার, ২৭ জুলাই ২০১৯

সর্বশেষ প্রকাশিত