কিশোর অপরাধ দমনে সামাজিক ও রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয় বন্ধ এবং প্রশাসনের আন্তরিকতা প্রয়োজন

কিশোর অপরাধ দমনে সামাজিক ও রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয় বন্ধ এবং প্রশাসনের আন্তরিকতা প্রয়োজন

মোহাম্মদ মন্‌জুরুল আলম চৌধুরী

সোমবার, ২৯ জুলাই ২০১৯


অপরাধ বা মারা

আমরা ক্রমশ বন্য আদিম অসভ্যতা বর্বরতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। শ্রেষ্ঠ জীব মানব থেকে দানবে পরিণত হচ্ছি। পরিণত হচ্ছি নরপিশাচ জানোয়ারে। মানুষের প্রতি মানুষের দরদ মায়া মমতা সহানুভূতি সহমর্মিতা ভালোবাসা স্নেহ সম্মান শ্রদ্ধা দিন দিন যেন লোপ পেতে বসেছে। ভুলে যেতে বসেছে মানবতা সামাজিকতা আন্তরিকতা সৌজন্যতা বিনয় নৈতিকতা ধর্মীয় রীতিনীতি এবং অনুশাসন। অতি তুচ্ছ কারণেও মানুষ মানুষের প্রাণ নিতে ভয় পায় না আজকাল। জীবন্ত মানুষকে চাপাতি রামদা কিরিচ দিয়ে কুপিয়ে লাঠিপেটা করে গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুনে পুড়িয়ে মারতে কারো বুক এতটুকু কেঁপে উঠছে না। শিশু, নারী নির্যাতন, নিপীড়ন, যৌন হয়রানি, ধর্ষণ, খুন হত্যার পাশাপাশি দেশে ইদানীং গণপিটুনিতে বর্বর, পশাবিক, নির্মম, নিষ্টুরতার শিকার হচ্ছে যার প্রায় সবাই নিরীহ শ্রেণীর মানুষ। গত ১৮ জুলাই’১৯ থেকে ২১ জুলাই’১৯ পর্যন্ত মাত্র চার দিনে দেশে গণপিটুনিতে শিকার হয়ে নিহত হয়েছে সাতজন। আর বিগত সাত মাসে সারাদেশে মোট নিহতের সংখ্যা হচ্ছে ৩৭ জন। পাশিপাশি দেশের ভবিষ্যতের জন্য ভয়াবহ, ভয়ংকর উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠার বিষয় হচ্ছে কিশোর অপরাধ যা দিন দিন আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। কিশোরদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ চুরি, হত্যা, আত্মহত্যা, ধর্ষণ, ছিনতাই, পকেটমার, মাদক সেবন, ইভ টিজিংসহ এমন সব ভয়াবহ কাজ ও অঘটন ঘটিয়ে চলছে এবং এমন লোমহর্ষক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে, যা কল্পনাও করা যায় না। দেশের আগামী ভবিষ্যৎ এদেশের শিশু কিশোরদের বিভিন্ন ভয়ংকর এবং ভয়াবহ অপরাধে জড়িয়ে পড়া মানুষকে আতঙ্কিত, শঙ্কিত, উদ্বিগ্ন, উৎকণ্ঠিত করে তুলছে। বিগত দিনে ঘটে যাওয়া কয়েকটি ঘটনার কথা এখানে উল্লেখ করা গেল কিশোর অপরাধের সংশ্লিষ্টতা এবং ভয়াবহতা বুঝানোর জন্য। “গত ১৮ জুলাই’১৯ কথা কাটাকাটির জের ধরে চট্টগ্রাম মহানগরীর পাহাড়তলীতে বন্ধুরা পিটিয়ে হত্যা করেছে এক তরুণকে। ওই তরুণ একটি কিশোর অপরাধী গ্যাং-এর সদস্য বলে জানিয়েছে পুলিশ। ১২ জুলাই’১৯ পদ্মা সেতু তৈরি নিয়ে ফেসবুকে গুজব ছড়ানোর অভিযোগে র‍্যাবের হাতে গ্রেপ্তার আরমানের আরমানের বয়স ১৯ বছর। ১০ জুলাই’১৯ খুলশী থানা পুলিশ হাজী মুহাম্মদ মহসিন কলেজের ছাত্র জিয়াউল হক নয়নকে অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায়কালে মোঃ আবিদ ওয়াসিফ প্রকাশ এনি (২১) ও মোঃ নুর হোসেন প্রকাশ নুরু (২১) নামে দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। ৮ জুলাই’১৯ কর্ণফুলীতে জমি সংক্রান্ত বিরোধের জেরে এক নৈশ প্রহরীকে খুনের ঘটনায় তার ভাতিজা নকিবুল হক সৌরভকে (১৯) গ্রেপ্তার করে পিবিআই। ৩০ জুন’১৯ নগরীর আকবরশাহ থানাধীন বিশ্বকলোনি এলাকায় মহসিন (২৬) নামে এক যুবলীগ কর্মীকে কথিত বড় ভাইয়ের নির্দেশে নির্মমভাবে পিটিয়েছে প্রতিপক্ষের লোকজন। এ ঘটানায় জড়িত যাদের বয়স ১৭ থেকে ২০ বছর”। {সূত্রঃ আজাদী, ২০ জুলাই’১৯}। জানা যায় পুলিশের কাছে তথ্য রয়েছে যে, সন্ধ্যার পরে নগরীর স্টেশন, রোড, বিআরটিসি মোড়, কদমতলী, চকবাজার, চট্টগ্রাম কলেজ সংলগ্ন প্যারেড কর্নার হয়ে মোড়ের কেয়ারী ইলিশায়ম, মেডিকেল হোস্টেল, শিল্পকলা একাডেমী, জিইসি মোড়, সিআরবি, খুলশি, ফয়ে’স লেক, ঢেবার পাড়, চান্দগাও শমসের পাড়া, ফরিদের পাড়া, আগ্রাবাদ সিজিএস কলোনি, সিডিএ, ছোটপুল, হালিশহর, বন্দর কলোনি ও পতেঙ্গার বেশ কয়েকটি এলাকায় মাদক বেচাকেনাসহ মোটরসাইকেল ও সাইকেল ছিনতাই, দেওয়ানবাজার সাব এরিয়ার মাছ ও কাঁচা বাজারে চাঁদাবাজি, গান-বাজানা, খেলার মাঠ, ডান্স ও ডিজে পার্টি, ক্লাবের আড্ডাসহ বেশ কিছু বিষয় নিয়ন্ত্রণে মরিয়া কিশোর গ্যাং চক্র।

উপরোক্ত ঘটনাগুলো শুধু চট্টগ্রামে ঘটে যাওয়া কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি সারা দেশে সংঘটিত ভয়াবহ, ভয়ংকর কিশোর অপরাধের আলোচিত সমালোচিত ঘটনার কিছু চিত্র মাত্রা। দেশের আলোচিত বরগুনায় রিফাত শরীফ হত্যা মামলার আসামিরাও ০০৭ নামক ফেসবুক ভিত্তিক একটি কিশোর গ্যাং-এর সদস্য। যেখানে প্রায় তিন শতাধিক কিশোর এই গ্যাং-এর সঙ্গে জড়িত বলে জানা যায়। কিশোরদের অপরাধ কর্মকাণ্ডে যে তথাকথিত বড় ভাইদের আশ্রয় প্রশ্রয়ে রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় হচ্ছে তা জনসাধারণের কাছে স্পষ্ট হয়ে গেছে ইতিমধ্যে। এসব কিশোররা ভাগ-বাটোয়ারা এবং নিজেদের মধ্যে অশুভ প্রতিযোগীতার কারণে নিজেদের মধ্যে নিজেরাও বিভিন্ন সংঘর্ষে এবং খুনোখুনিতে জড়িয়ে পড়ছে। যেমন উপরে বর্ণিত সাগরিকায় ছিনিয়ে নেয়া মোবাইল নিয়ে ঝগড়ায় বন্ধুরাই মোবারক হোসেনকে (২০) পিটিয়ে হত্যা করেছে। এ ঘটনায় রুবেল (১৯) ও হৃদয় (১৮) নামের দুই কিশোরকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যায়, বরগুনার রিফাত শরীফও নাকি নয়ন বন্ড, রিফাত ফরাজী, ঈশান ফরাজীদের গ্রুপে আগে যুক্ত ছিল। তাদের মধ্যে বিভিন্ন দ্বন্ধের এক পর্যায়ে নিহত রিফাত শরীফ ঈশান ফরাজীকে হাতুড়ি পেটা করে আবার মিন্নীকে নিয়ে দ্বন্ধ ছিল রিফাত শরীফ এবং নয়ন বন্ডের সাথে। তাছাড়া সবাই মাদক সেবন, বেচাকেনা সহ নানান অপরাধে জড়িত ছিল তা আজ সকলের কাছে সুস্পষ্ট। দেশের বিভিন্নস্থানে ছেলেধরা গুজবে মর্মান্তিক, হৃদয়বিদারক গণপিটুনিতে অসংখ্যসংখক কিশোরদের সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে। গত ২০ জুলাই’১৯ ছেলেধরা সন্দেহে তাসলিমা বেগমকে (৪০) ঢাকার উত্তর-পূর্ব বাড্ডা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গণপিটুনিতে হত্যাকারীদের ৪ জনকে গ্রেপ্তার করা হয় তাদের মধ্যে জাফর হোসেন (১৮) এবং শহিদুল ইসলাম (২১) হচ্ছে কিশোর। গণপিটুনির ভাইরাল হওয়া বিভিন্ন ভিডিওতে দেখা যায় কিশোরদের অংশগ্রহণ যাতে দেখা যায় তাদের হিংস্র আচরণ এবং আক্রান্ত ব্যক্তিকে বেধড়ক পিটুনি দিতে। সমাজের তথাকথিত বড় ভাই, শীর্ষ সন্ত্রাসী, স্থানীয় নেতা, জনপ্রতিনিধি, মাদক ব্যবসায়ী, ভূমিদস্যু, সন্ত্রাসী-চাঁদাবাজ, প্রভাব এবং প্রতিপত্তিশালী মানুষ তাঁদের নিজেদের স্বার্থে, নিজ নিজ এলাকায় তাঁদের শক্তি ও সামর্থ্য প্রদর্শন এবং আধিপত্য ও প্রভাব বিস্তারের জন্য কিশোরদের ব্যবহার করছে। কেননা অভাবের তাড়নায় লেখাপড়া ফাঁকি দেয়া বখাটেপনায় লিপ্ত কিশোর, ধনী বা বড়লোকদের সন্তানদের প্রতি উদাসীনতার কারণে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন কিশোর, ধনীর সন্তানদের প্রয়োজনের অতিরিক্ত টাকা প্রদান ও তা খরচ করতে গিয়ে অনেকেই বিভিন্ন নেশার সাথে আসক্ত হয়ে নানান অপরাধের সঙ্গে পড়ছে। পাশাপাশি মাদকাসক্ত কিশোর বর্তমান আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবেশ পরিস্থিতির কারণে বিভিন্ন অপরাধের সাথে জড়িয়ে পড়ছে অথবা ব্যবহৃত হচ্ছে। তাছাড়া বেকারত্ব, প্রেমে ব্যর্থতা, লেখাপড়ার সুযোগের অভাব, পরীক্ষায় অকার্যকারিতা, পরিবার পরিজন বিচ্ছিন্নতা, হতাশা, মাদকের সহজলভ্যতা ইত্যাদি কারণেও কিশোররা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। আধুনিককালে শহরগুলোতে দেখা যায়, মা-বাবা উভয়ে ঘরের বাইরে কাজ করছেন। ফলে সন্তান তাঁদের উপযুক্ত স্নেহ-শাসন থেকে বঞ্চিত হচ্ছে এবং অনেক ক্ষেত্রেই তারা আচরণে বিদ্রোহধর্মী হয়ে যাচ্ছে। পাশাপাশি অনেক ক্ষেত্রে অসৎ সঙ্গকেও কিশোর অপরাধের জন্য দায়ী করা হয়। আমাদের দেশে ধর্মীয় শিক্ষা, ধর্মীয় অনুশাসন, সামাজিক মানসিক বিকাশের উৎসের বা ক্ষেত্রের বড় এবং করুণ অভাব। আলগা পারিবারিক বন্ধ, পারিবারিক অশান্তি, খেলাধুলা, সৃষ্টিশীল ও মননশীলতার সুন্দর প্রকাশের অভাবের পাশাপশি শিশু কিশোরদের নৈতিক শিক্ষাদানে ঘাটতিও রয়েছে প্রচুর। উন্মুক্ত আকাশ সংস্কৃতির আগ্রাসী আগ্রাসন, ইন্টারনেটের সহজলভ্যতা, স্মার্ট ফোনের আর ফেসবুকের অপব্যবহার নানাবিধ কারণে অশ্লীল, নোংরা অপসংস্কৃতির মাথা ছাড়া দিয়ে উঠা, পর্ণ বা নীল ছবির দংশন, প্রগতিশীলতা বা নারী স্বাধীনতার নামে তরুণ তরুণীদের অবাধ মেলামেশা কিশোরমনে বিরূপ প্রভাব পড়ছে যা তাঁদেরকে অপরাধের দিকে ধাবিত করছে প্রতিনিয়ত। অনেকের মনে একটা রোমাঞ্চ, দুঃসাহসিকতা, অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয়তা, অতিমাত্রায় ছায়াছবিপ্রিয়তা, থ্রিল এবং নিজেদেরকে হিরো ভাবার কারণেও অনেকের মনে অপরাধ প্রবণতা চেপে বসে। ফলশ্রুতিতে অনেকেই নিজের অজান্তেই বিভিন্ন অপরাধের সাথে জড়িয়ে পড়ছে। মানবিক, সামাজিক, রাজনৈতিক, নৈতিক, ধর্মীয় অবক্ষয়ের কারণে মানুষ আজ অমানুষ, দানব আর জানোয়ারে পরিণত হচ্ছে। এর মূলে রয়েছে অর্থ-বিত্ত্ব, প্রভাব-প্রতিপত্তি, রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয়, প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তা তথা আইনশৃঙ্খলা-রক্ষাকারী বাহিনীর ক্ষেত্রবিশেষে দায়িত্বের প্রতি অবহেলা, অর্থ লোলুপতা, রাজনৈতিক শক্তি এবং প্রভাবশালীদের সাথে আঁতাত ইত্যাদি কারণেও কিশোর অপরাধ বৃদ্ধি পাচ্ছে বলে সমাজ বিজ্ঞানীদের ধারণা।

আজকের শিশু আগামীর নেতা। তাঁদেরকে অবশ্যই অপরাধ প্রবণ মন-মানসিকতার জন্য ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ, দেশ আর রাষ্ট্রকে যথোপুযক্ত শিক্ষা, মাদক নিরাময় কেন্দ্রে ভর্তি, মানবিকতা, নৈতিকতা, ধর্মীয় শিক্ষা প্রদান করে দেশের যোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার পরিবেশ দিতে হবে এবং সৃষ্টি করতে হবে। সামাজিক, রাজনৈতিক এবং ধর্মীয় অঙ্গীকার ছাড়া কিশোর অপরাধসহ কোন অপরাধই দমন সম্ভব নয়। রাজনীতিবিদ, জনপ্রতিনিধি, সমাজপতিরা যদি অপরাধীদের আশ্রয় প্রশ্রয় না দেয় এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যদি তাঁদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করে তবেই কিশোর অপরাধসহ সব অপরাধ সমূলে উৎপাঠন করে সম্ভব। অন্যথায় তা হবে শুধু অরণ্যে রোদন মাত্র।


  • পড়া হয়েছেঃ ৭৪ বার
  • প্রকাশিতঃ সোমবার, ২৯ জুলাই ২০১৯

সর্বশেষ প্রকাশিত