নাম তার করিম

নাম তার করিম

লাবু সরকার

শুক্রবার, ১৭ মে ২০১৯


নাম তার করিম। বাসের হেলপার। বয়স বারো কি তের। গায়ের রং কোন একসময় হয়তো ফর্সা ছিল, এখন তামাটে হয়ে গেছে।

যাচ্ছি আশুলিয়া, সৌভাগ্যক্রমে করিম হেলপারের বাসএ আমার সিট হয়েছে। আমি যখনি যেখানে যাই, অস্বাভাবিক কিছু চোখে পড়লে, তার রহস্য উদঘাটনে তৎপর থাকি। এই কিছুদিন আগে সুপ্রভাত বাসএ বসে আছি। জ্যামে আটকা পড়েছি। এমতাবস্থায় আমাকে বহনকারী গাড়ির ড্রাইভারের সাথে পাশের গাড়ির ড্রাইভার সাথে কথা বলছে। কি যেন বলছে। আমি কান খাড়া করে শুধু এটুকুই শুনলাম, আছে আপনার কাছে? আমাদের গাড়ির ড্রাইভার মাথা নাড়লো। তারমানে নেই। আমি আন্দাজের উপর ডিল ছুড়লাম। ড্রাইভারের পাশে গিয়ে বসলাম। এবং বললাম তিনি কি চায় মামা? নিশ্চয় গাঞ্জা? ড্রাইভার আমার দিকে তাকালো, এবং কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো। মামা আপনি ভদ্রলোক মানুষ, আপনি কি করে বুঝলেন? আমি একটু ভাব নিয়ে তাদের সুরেই বললাম মামা ১২ শ ইঁদুর মেরে ভদ্রলোক হইছি। হা করলেই হামিদপুর পর্যন্ত বুঝে যাই।

যাহোক থাক ওসব কথা। করিম সাহেব গান গাচ্ছে "মধু হই হই বিষ খাওয়াইলা" দারুণ মিষ্টি গলা। আমি পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করে একশো টাকার একটি নোট হাতে ধরিয়ে দিলাম। আমার দেখাদেখি আরো কজন কিছু টাকা দিল। বাঙালির একটা স্বভাব খুবই ভালো, কাউকে দান বা উপহার দিতে দেখলে অন্যরাও ফলো করে। ফলো কাজটা বাঙালিরা অতিমাত্রায় পারে। সেটা হোক ভালো কিংবা মন্দ।
টাকা পেয়ে করিম মিয়া খুব খুশি। আরো কয়েকটি গান শুনাইলো। সব যাত্রীর দৃষ্টি বাউল করিম মিয়ার দিকে। বাউল বললাম এ কারণে, করিম মিয়ার গলাটা বাউলদের মতো। আর সে সবগুলো বাউল গান'ই গেয়েছে। যাহোক, গান শেষ হলে আমি করিম মিয়াকে জিগ্যেস করলাম, সে স্কুলে যায় কিনা! করিম মিয়ার সোজাসুজি উত্তর স্কুলে গিয়ে কি করতাম! গাড়িতে থাকলে খাবার দেয়, টাকা দেয়। স্কুলে কি দেয়? আমি ওর প্রশ্নের উত্তর দিতে পারিনা, সত্যিইতো স্কুল কি দেয়? এইযে আমরা ইউনিভার্সিটির সর্বোচ্চ ডিগ্রিধারী মানুষেরা আছি। অনেকেই হয়তো প্রতিদিন নিয়ম মেনে অফিস করছি, সন্তানদের জীবন গড়ে দিচ্ছি। অথচ একবারের জন্যও অন্যের সন্তান বা জীবনের দিকে তাকাচ্ছিনা। করিমদের মতো অসহায়, বঞ্চিত মানুষদের নিয়ে ভাববার সময় হয়তো আমাদের নেই। কিন্তু সময় আমাদের দিতেই হচ্ছে বউ ও সন্তান নামক একটি স্থূল জায়গায়। কতো সময় প্রতিনিয়ত কেড়ে নিচ্ছে তারা একবার ভেবে দেখেছেন কি? আপনি, আমি হয়তো সমাজের কাছে মানুষ। কিন্তু বিবেকের কাছে আপনি কি? আমরা কি আদৌ মানুষ হতে পেরেছি? আমরা দেশের জন্য, সমাজের জন্য, দেশের অসহায় মানুষের জন্য কি করছি? আমরা শিক্ষিত অনেকেই বাবা-মাকে পর্যন্ত লালনপালন করিনা। আমরা শিক্ষিত শুধু নিজেকে লাভবান করার জন্য, নিজের স্বার্থ উদ্দারের জন্য।

তখনো করিম গান গাইছিল। মনে অনেক সুখ করিমের। করিমকে জিগ্যেস করে আরো তথ্য পাওয়া গেল। করিম এ বয়সেই 'স্টিক' খায়। আমি অবাক হই ওর কথায়! কোথা থেকে আনে? কিভাবে খায়? করিম আমাকে বোঝাতে লাগলো। আমি করিমের কথাবার্তায় মুগ্ধ হয়ে করিমকে গুরু মানতে শুরু করলাম। সে এ বয়সে যা আয়ত্ত করেছে (হোক ভালো কিংবা মন্দ) তা আমরা অনেকে এ বয়সে এসেও করতে পারিনি। আমরা সবসময় তুলতুলে বিছানায় ঘুমাতে ভালোবেসে গেলাম। একবার ইটের বালিশে মাথা রাখার সাধ জাগলোনা। মানুষের মধ্য ভালোমন্দ সব ধরনের সাধ থাকা উচিত। সমাজের উঁচু তলার মানুষদের মাঝেমাঝে নিচু তলায় আসা দরকার। অনুরূপ নিচুতলার মানুষদেরও উঁচু তলায় গিয়ে তার সাধ নেয়া উচিত। উভয়ে উভয়ের সাধ নিলে একটা মেল বন্ধন সৃষ্টি হবে। হয়তো তখন করিমেরা আর এ বয়সে বাসএর হেল্পারি করবেনা, গাঁজা সেবন করবেনা। হয়তো সমাজ তাদের বিপথে যেতে দেবেনা।

নয়তো, করিম হয়তো আস্তে আস্তে অস্বাভাবিক জীবনে চলে যাবে। বড় অপরাধের দিকে চলে যাবে। কিন্তু আমার প্রশ্ন করিমকে স্বাভাবিক জীবনদান করা কার দ্বায়িত্ব? ঢাকা সহ সারাদেশে করিমের মতো অসংখ্য করিম ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। তাদের ভবিষ্যৎ কি এভাবেই ইস্টিকের ধোঁয়ায় হারিয়ে যাবে? করিমেরা কি সুস্থ স্বাভাবিক জীবনের দেখা পাবেনা?
রাষ্ট্র উত্তর চাই?
উত্তর দেয়া যাবে কি?


  • পড়া হয়েছেঃ ১১০ বার
  • প্রকাশিতঃ শুক্রবার, ১৭ মে ২০১৯

সর্বশেষ প্রকাশিত